৩০ অক্টোবর ২০২৬

কর্ণফুলীতে সিডিএ’র ইজারা, পিডিবির ঝুঁকি ও সওজের নীরবতা— ত্রিমুখী ব্যর্থতায় বিপন্ন জনস্বার্থ!

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেক মোড়ে সড়কের পাশের জমি দখল করে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে আব্দুল মান্নান নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

অভিযোগে বলা হচ্ছে, তিনি শুধু সড়কই নন, পিডিবির বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খুঁটিও নিজের দখলে নিয়ে ঝুঁকি তৈরি করেছেন। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ না করলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

জানা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে সরকারি জমিতে রেস্টুরেন্ট, সুইটস ও হার্ডওয়ারের দোকান তুলে সেগুলো ভাড়া দিয়েছেন মান্নান। এসব স্থাপনার ডেকোরেশন এমনভাবে করা হয়েছে যে পিডিবির একাধিক খুঁটি দোকানের ভেতরে চলে গেছে। অথচ কর্ণফুলী বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের দূরত্ব এসব স্থাপনা থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ গজ।

স্থানীয়রা মনে করছেন, এসব কার্যক্রমের পেছনে সরকারি দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে মান্নানের ‘ঘনিষ্ঠতা’ রয়েছে এবং মোটা অঙ্কের ঘুষের লেনদেন হয়েছে বলে সন্দেহ তাদের।

সিডিএ’র জমি ও ইজারার শর্তলঙ্ঘনে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১১ জুন সিডিএ’র (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) মালিকানাধীন ৩.৭৭ কাঠা জমি কাঠাপতি ৪০ হাজার টাকা বার্ষিক ভাড়ায় ইজারা নেন মান্নান। ইজারার শর্ত ছিল— জমি শুধু যাতায়াতের পথ ও বাগান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, কোনো স্থাপনা নয়। কিন্তু সেই শর্ত ভঙ্গ করে বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে ।

এ ছাড়া, ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, তার নামে আর.এস. দাগ ১৪৬২-তে ২ শতকের পরিবর্তে ৩ শতক দেখিয়ে নামজারি করা হয়েছে এবং ৭ তলা ভবন নির্মাণে সিডিএ’র অনুমোদন না থাকলেও উপজেলা পরিষদের সঙ্গে ‘লিয়াজোঁ’ করে প্ল্যান অনুমোদন নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিব) কর্ণফুলী উপকেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অরিঞ্জয় চৌধুরী জানান, দখলদারকে স্থাপনা অপসারণের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা ‘পাত্তা না দিয়ে’ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই। সরকারি অন্য দপ্তরগুলো চাইলে আমরা সহযোগিতা করতে পারি।’ এ অবস্থায় স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছেন, আইন প্রয়োগে এত ‘স্থবিরতা’ কেন?

সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান জানান, চুক্তি শর্ত ভঙ্গ করায় তারা ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই আদালতে মামলা করায় উচ্চ আদালত সিডিএ’র কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়।

সিডিএ’র অথরাইজড সেকশনের কর্মকর্তা তানজিব হোসেন বলেন, ‘আমরা কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে তিনি উচ্চ আদালতে মামলা করেন এবং আদালত স্থগিতাদেশ দেওয়ায় এগুতে পারিনি। বিষয়টি আইন শাখায় পাঠানো হয়েছে।’

সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, ‘আমরা খোঁজ নেব। নিয়মের বাইরে অনিয়মের সুযোগ নেই। শিগগিরই প্রকৌশলী পাঠিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হবে।’

তবে স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও আইনি জটিলতা ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কর্তৃপক্ষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিডিএ’র কঠোর অবস্থান না নিলে পিডিবির সঞ্চালন লাইন ঝুঁকিতে থেকেই যাবে— এমনটাই আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের।

এই ঘটনা সিডিএ আইন-২০১৮-এর ১৯ ধারার (অনুমোদন ব্যতীত স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা) এবং ২২ ধারার (জনস্বার্থে ইমারত অপসারণের ক্ষমতা) স্পষ্ট লঙ্ঘন নির্দেশ করে । এছাড়া, সড়ক ও জনপথ আইনে সরকারি সম্পদ সংরক্ষণের বিধান প্রযোজ্য।

তবে আইনি জটিলতা এড়াতে গেলে এখানে প্রশ্ন ওঠে— কেন সিডিএ প্রশাসনিক আদেশে স্থাপনা অপসারণ না করে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নিচ্ছে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিকল্প নেই। একইসঙ্গে, পিডিবি যেহেতু নিজের খুঁটির সুরক্ষায় ব্যর্থ, সেহেতু সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা জরুরি, যা ইতোমধ্যে জনস্বার্থের প্রশ্নে ‘শিথিল আইন প্রয়োগের’ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

স্থানীয় প্রশাসন ও সিডিএ’র উচিত, আদালতের আদেশ যথাযথভাবে প্রতিপালনের পাশাপাশি জনস্বার্থে বিকল্প আইনি কৌশল খতিয়ে দেখা, যা ‘গঠনমূলক সমালোচনার’ আওতায় পড়ে— ত্রুটি চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বাতলে দেওয়া।

আরও পড়ুন