২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি

কোটি টাকার নতুন সেতু অচল, মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে চলাচল শতবর্ষী ব্রিজে

কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সেতু দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষীর মতো। অথচ তার পাশেই শত বছরের পুরোনো একটি জরাজীর্ণ সেতু যেন প্রতিদিন মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়েই পার করছে শত শত মানুষ। সেতুর পিলারে ফাটল, রেলিং ভাঙা, দুই পাশের সংযোগ অংশ ধসে গেছে বহু আগেই। বর্ষার ভারী বৃষ্টিতে আরও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে কাঠামো। তারপরও থেমে নেই যান চলাচল। কারণ, বিকল্প কোনো পথ নেই।

এ যেন উন্নয়নের এক নির্মম বৈপরীত্য— একদিকে নতুন সেতু ব্যবহারহীন, অন্যদিকে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ সেতুতে প্রতিদিন ঝুলছে মানুষের জীবন।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়ন ও কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের লাখো মানুষের যোগাযোগের একমাত্র সড়ক ঈদগাঁও–ঈদগড়–বাইশারী সড়কের রেনুরছড়া খালের ওপর অবস্থিত এই শতবর্ষী সেতুকে ঘিরে এখন চরম উৎকণ্ঠায় স্থানীয় মানুষ।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর নিচের পিলারে বড় বড় ফাটল, রেলিংয়ের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ে আছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাশের সংযোগ সড়ক দেবে গিয়ে বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ভারী যানবাহন চলাচলের সময় পুরো সেতু কেঁপে ওঠে। অনেক চালক সেতুর মাঝখানে এসে গতি কমিয়ে ধীরে ধীরে পার হচ্ছেন। কারও চোখে আতঙ্ক, কারও মুখে ক্ষোভ। অথচ ঠিক পাশেই প্রায় পাঁচ বছর আগে নির্মিত নতুন সেতুটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। শুধু মূল সড়কের সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মাণ না হওয়ায় সেটি আজও চালু করা হয়নি। ফলে কোটি টাকার সেই সেতু কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন- যে সেতু দিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে, সেটি বন্ধ রেখে কেন মৃত্যুঝুঁকির সেতুতে চলাচল করতে হবে?

স্থানীয় সিএনজি চালকরা জানান, দুর্ঘটনা এড়াতে কয়েক দফা নিজেরাই চাঁদা তুলে সেতুর দুই পাশের ভাঙা অংশে মাটি ও ইট ফেলে সাময়িকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু বর্ষার পানিতে সেই সংস্কার বারবার ভেসে গেছে। এরপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

চালকদের অভিযোগ, প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়েই তাদের গাড়ি চালাতে হয়। ভারী ট্রাক উঠলে পুরো সেতু কেঁপে ওঠে। তখন মনে হয়, এই বুঝি ভেঙে পড়ল।

বর্ষায় বেড়েছে ঝুঁকি, আতঙ্কে মানুষ
চলমান বর্ষা মৌসুমে টানা ভারী বর্ষণের কারণে সেতুর চারপাশের মাটি আরও সরে গেছে। নিচের অংশে পানি প্রবাহের কারণে ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তাদের ভাষ্য, কোনো একদিন হঠাৎ করেই যদি সেতুটি ধসে পড়ে, তাহলে শুধু প্রাণহানিই নয়, ঈদগড় ও বাইশারীসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন— সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়বে।

ঈদগড় সিএনজি সমিতির সভাপতি ও চালক মো. ফয়সাল বলেন, প্রতিদিন ভয় নিয়ে ব্রিজ পার হই। ভারী গাড়ি উঠলে মনে হয়, এখনই ভেঙে যাবে। নতুন ব্রিজ বানিয়ে রেখেছে, কিন্তু ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। আর কতদিন এই ঝুঁকি নিয়ে চলতে হবে?

সিএনজি চালক মো. আবুল বাশার বলেন, আমরা নিজেরাই কয়েকবার ভাঙা অংশ মেরামত করেছি। কারণ দুর্ঘটনা হলে তো আমাদেরই মরতে হবে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়নি।

ট্রাক চালক মো. আবু ছৈয়দ বলেন, প্রশাসনকে বহুবার জানিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। দুর্ঘটনা ঘটার পর যদি ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সেই ব্যবস্থা আর কারও জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না।

টমটম চালক মো. মুহিন বলেন, কোটি টাকার নতুন ব্রিজ পড়ে আছে। অথচ পুরোনো মৃত্যুফাঁদ ব্রিজ দিয়ে মানুষ চলাচল করছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক।

অটো চালক মো. মঞ্জুর বলেন, যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রতিদিন আমরা শুধু আল্লাহর ভরসায় গাড়ি চালাই।

মাইক্রোবাস চালক মো. লালু বলেন, প্রতিদিন শত শত মানুষ এই ব্রিজ দিয়ে চলাচল করে। কেউ মারা গেলে তখন হয়তো সবাই নড়েচড়ে বসবে।

ঈদগড় ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. খুরশেদ আলম বলেন, প্রায় পাঁচ বছর আগে নতুন ব্রিজের নির্মাণ শেষ হয়েছে। কিন্তু সংযোগ না থাকায় সেটি চালু হয়নি। মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ব্রিজ ব্যবহার করছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ঈদগড় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন সিকদার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ব্রিজ দিয়ে প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করছে। যে কোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত নতুন ব্রিজের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।

এ বিষয়ে রামু উপজেলা প্রকৌশলী মো. কফিল উদ্দিন বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা আছে। চলতি অর্থবছরেই সংযোগ সড়কের কাজ সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে পুরো সড়কের উন্নয়নকাজও শুরু হবে। আশা করছি দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একটি প্রস্তুত নতুন সেতু অব্যবহৃত রেখে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা বলছেন, একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় না থেকে এখনই নতুন সেতুর সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হোক। নইলে যে কোনো মুহূর্তে রেনুরছড়া খালের ওপর এই শতবর্ষী সেতু ভয়াবহ ট্র্যাজেডির সাক্ষী হতে পারে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ