চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান মেসার্স জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল কাস্টমসের অনুমতি ছাড়া সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের সিইপিজেড বিভাগের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ৫৮৫ কোটি ৩২ লাখ ১৭ হাজার ৩৯১ টাকা ৪২ পয়সা শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে।
কাস্টমসের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৫ জুলাই সিইপিজেডের সেক্টর-৬-এ অবস্থিত জেএমএস গার্মেন্টসের কারখানা সরেজমিন পরিদর্শন করেন নিরীক্ষাকারী দলের সদস্যরা। পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ।
কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, কারখানার গুদামে তিন ধরনের মোট ১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৯ কেজি কাঁচামাল থাকার কথা ছিল। কিন্তু সরেজমিনে পাওয়া যায় মাত্র ২ লাখ ৮২ হাজার ৮০৮ কেজি। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের কোনো হদিস মেলেনি।
কাপড়ই নেই ৮৭ লাখ কেজির বেশি
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অনুপস্থিত কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে ৮৭ লাখ ৫৩ হাজার ৫৪৭ কেজি কাপড়। এসব কাপড়ের আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে প্রযোজ্য শুল্কের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮২ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৮৮৪ টাকা।
এ ছাড়া ৫১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫ কেজি এক্সেসরিজের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এসব এক্সেসরিজের আনুমানিক মূল্য ৭৪ লাখ মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৬ টাকা।
একইভাবে ৬৭ হাজার ৬ কেজি প্যাকিং উপকরণ অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। এসব উপকরণের বিপরীতে শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ ৮২ লাখ ৬৬ হাজার ২৬০ টাকা।
সব মিলিয়ে কাস্টমসের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে হিসাববহির্ভূত বা অবৈধভাবে অপসারিত কাঁচামালের বিপরীতে ৫৮৫ কোটি ৩২ লাখ ১৭ হাজার ৩৯১ টাকা ৪২ পয়সা শুল্ক-কর ফাঁকির হিসাব দেওয়া হয়েছে।
বন্ধ ঘোষণার পর কাঁচামাল সরানোর অভিযোগ
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেডকে ২০২৫ সালের ১৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই মূলত বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হুমায়ারা শামস এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তাফা মাহমুদ। কাগজপত্র অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে বিদেশি পরিচালক হিসেবে স্টেফিন ভুজিংক ও নাগাই ফুং চান রয়েছেন।
ব্যাংকের পাওনাও শতকোটি টাকা
শুধু কাস্টমস রাজস্ব নয়, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক দায় নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। রপ্তানি করতে ব্যর্থতা এবং ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটির লিয়েন ব্যাংক এক্সিম ব্যাংক লিমিটেডে ১১৭ কোটি ৯৩ লাখ ৯৬ হাজার ৬৬২ টাকা ২৭ পয়সার ‘ফোর্সড লোন’ সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম ব্যাংক খাতের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেছে নিরীক্ষা দল।
আগেও শুল্ক ফাঁকির মামলা
এর আগে অবৈধভাবে কাঁচামাল অপসারণের অভিযোগে জেএমএস গার্মেন্টসের বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ ৪০ হাজার ৭১৯ টাকা শুল্ক ফাঁকির একটি মামলা হয়েছিল। ওই মামলায় প্রতিষ্ঠানটি অর্থ জমা দিলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করেছে। মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পাওনা আদায়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব স্থগিত অথবা সম্পদ ক্রোকের ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কারণ দর্শানোর নোটিশের সুপারিশ
জেএমএস গার্মেন্টসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কাস্টমসের নিরীক্ষা দল।
সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা প্রবীর নাথ, রাজস্ব কর্মকর্তা সারোয়ার আলম এবং যুগ্ম কমিশনার অনুপম চাকমার স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অবিলম্বে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি এবং প্রায় ৫৮৫ কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাঁচামাল কীভাবে কারখানার গুদাম থেকে উধাও হলো এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত— এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। কাস্টমসের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির তথ্য উঠে আসার পর জেএমএস গার্মেন্টসের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।














