রাজনৈতিক কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরনো দখল ফিরে পাওয়ার চেষ্টা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত— সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের দাপট। প্রকাশ্যে পিস্তল বের করে গুলি, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আতঙ্ক। বিশেষ করে রাউজানে ধারাবাহিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। গত মার্চ থেকে মে— এই তিন মাসে সারাদেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮ এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে হত্যাকাণ্ডে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা রেঞ্জ। তিন মাসে সেখানে ২০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম রেঞ্জ— ১৮৬টি। রাজশাহী রেঞ্জে ১০৬ এবং খুলনা রেঞ্জে ৮৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শুধু ঢাকা মহানগরীতেই বিভিন্ন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৭ জন।
তবে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আলাদা করে উদ্বেগ তৈরি করছে। রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে রাউজান এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে— এই তিন মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক সংঘাতের দুই শতাধিক ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহত ও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এসব সংঘাতের বড় অংশের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে রাউজানে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক কোন্দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্য বাজারে অটোরিকশায় এসে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা এবং নিজ বাড়ির সামনে জানে আলম সিকদারকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় রাউজানে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও। সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা।
শুধু রাউজান নয়, দেশের অন্যান্য এলাকাতেও রাজনৈতিক বিরোধ ও অপরাধী চক্রের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। খুলনায় বিএনপি কর্মী ও সাবেক রূপসা শ্রমিক দলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ হত্যা এবং মসজিদের ভেতর গুলিবর্ষণের ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। ঢাকার রামপুরায় কারাগার থেকে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘কাইল্যা পলাশ’ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও পুরনো অপরাধী চক্রগুলোর আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, অপরাধে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্রের একটি বড় অংশ সীমান্তপথে দেশে ঢুকছে। গত দেড় বছরে শুধু যশোর সীমান্ত এলাকায় ৬২টি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, তুরস্ক ও চীনে তৈরি বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক পিস্তল, একে রাইফেল ও ‘বেলঘরিয়া পিস্তল’সহ আগ্নেয়াস্ত্রের সন্ধান মিলেছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের জন্য আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। লুট হওয়া ৯৪৫টি অস্ত্রের মধ্যে এখনো প্রায় ১৬৫টি ভারী আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি বলে জানা গেছে। এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় নগর ও জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গত ১ মে থেকে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পৌনে দুই মাসের অভিযানে ১৫৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১ হাজার ৭৮৫ রাউন্ড গুলি, ৫২টি ম্যাগজিন, হাতবোমা ও বিপুল পরিমাণ গানপাউডার উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যে হারে হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটছে, তার তুলনায় উদ্ধার হওয়া অস্ত্র কি যথেষ্ট? নাকি অপরাধীদের হাতে এখনো বিপুলসংখ্যক অবৈধ অস্ত্র মজুত রয়েছে?
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, শুধু অস্ত্র উদ্ধার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। অস্ত্রের উৎস, সরবরাহকারী, সীমান্তপথের চোরাকারবারি, ক্রেতা-বিক্রেতা এবং এসবের পেছনে থাকা অর্থদাতা ও রাজনৈতিক-অপরাধী সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করতে হবে।
বিশেষ করে রাউজানের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা, কী কারণে সংঘাত ছড়াচ্ছে, অস্ত্র আসছে কোথা থেকে এবং এসব কর্মকাণ্ডে অর্থের জোগান দিচ্ছে কারা- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালের আগস্টে লুট হওয়া অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার এবং অপরাধীদের হাতে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে আরও জোরালো অভিযান প্রয়োজন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, “চট্টগ্রাম নগরীতে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অপরাধে জড়িত থাকলে তার রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় বিবেচনা না করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি (উপমহাপরিদর্শক) আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, “চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতাধীন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। অবৈধ অস্ত্রের উৎস, সরবরাহকারী ও ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তপথে অস্ত্রের প্রবেশ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো এলাকায় রাজনৈতিক সংঘাত বা সশস্ত্র অপরাধের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।”
সচেতন মহলের মতে, অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে থাকা সশস্ত্র অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে পিস্তল-গুলির এই মহড়া থামানো কঠিন হবে।
কারণ, অস্ত্রের নল যখন রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার নিশানা শুধু প্রতিপক্ষ থাকে না- ঝুঁকির মুখে পড়ে পুরো সমাজ।












