১০ অক্টোবর ২০২৬

বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রুল

ডিসকো শওকতের বিদেশি অর্থ ফেরত: ৩০ দিনে দুদককে নিষ্পত্তির নির্দেশ

ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে থাকা ২৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনার বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অর্থ ফেরাতে উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘ডিসকো শওকত’ নামে পরিচিত শওকত আলী চৌধুরীর এই অর্থ যুক্তরাজ্য থেকে দুবাইয়ে স্থানান্তরের ঘটনায় অর্থপাচারের অভিযোগও উঠেছে। একইসঙ্গে এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) করা আবেদনটি ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আজ মঙ্গলবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. হামিদুর রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

মামলায় দুদক ও এর চেয়ারম্যান, বিএফআইইউর প্রধান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং শওকত আলী চৌধুরীকে বিবাদী করা হয়েছে। রিটকারীর পক্ষে আদালতে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ আলী, সৈয়দ মামুন মাহবুব ও এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।

যুক্তরাজ্যে শওকতের ২৫ মিলিয়ন ডলার
রিট আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে থাকা সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) শওকত আলী চৌধুরীর নামে একটি ব্যাংক হিসাবে ২৫ মিলিয়ন ডলারের ‘আনডিসক্লোজড ফান্ড’ শনাক্ত করে।

রিটে বলা হয়, শওকত আলী সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের নাগরিক এবং সাইফুল আলম ওরফে এস আলমের সহযোগী। ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে এনসিএকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি— এমন দাবি করা হয়েছে আবেদনে।

তদন্তের সময় ওই অর্থ দুবাইয়ের মাশরেক ব্যাংক ও এমিরেটস এনবিডিতে স্থানান্তরের চেষ্টা করা হয় বলেও রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

চার সপ্তাহ আটকে রেখেছিল যুক্তরাজ্য
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়টি জানতে পেরে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ অর্থটি সাময়িকভাবে আটকে রেখে বিএফআইইউকে অবহিত করে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে ওই অর্থ বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে এনসিএ জানিয়েছিল। এজন্য চার সপ্তাহ অর্থটি আটকে রাখার কথাও জানানো হয়েছিল।

কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে বিএফআইইউ এনসিএর সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এরপর এনসিএ অর্থটি ছেড়ে দেয় এবং শওকত আলী ওই ২৫ মিলিয়ন ডলার দুবাইয়ে তাঁর হিসাবে স্থানান্তর করেন বলে রিটে দাবি করা হয়েছে।

তদন্ত হয়নি অর্থের উৎসের
পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শওকতের বিদেশি সম্পদের বিষয়ে অবগত হয়। তিনি আয়কর রিটার্নে বিদেশে থাকা ২৫ মিলিয়ন ডলার সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেন।

রিট আবেদনে বলা হয়েছে, এ কারণে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটে তিনি ১৩৬ কোটি টাকা আয়কর এবং ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দেন।

তবে অর্থের উৎস কী এবং কীভাবে তা বিদেশে নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয়ে দুদক বা অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্থা কার্যকর তদন্ত করেনি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

রিটকারীর দাবি, বিদেশি সম্পদ ঘোষণা করে কর ও জরিমানা দেওয়ার বিষয়টি অর্থের উৎস বা বিদেশে স্থানান্তরের বৈধতা যাচাইয়ের বিকল্প হতে পারে না। অর্থের উৎস ও স্থানান্তরের পদ্ধতি তদন্ত করলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অপরাধের বিষয়টি বেরিয়ে আসতে পারত বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএফআইইউর নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন
রিটকারীর আইনজীবী এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী বলেন, গত ১৩ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ এইচ এম রেজওয়ানুল সাইদ শওকতের বিরুদ্ধে ২৫ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাজ্য থেকে দুবাইয়ে স্থানান্তরের বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য দুদক ও বিএফআইইউতে আবেদন করেছিলেন।

তাঁর দাবি, এনসিএর তথ্য ও নথি থাকার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য সরকার বাংলাদেশকে ওই অর্থ ফেরত আনার জন্য একটি সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু যথাসময়ে আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়ায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।

হাই কোর্টের রুল
রিটে যুক্তরাজ্যের এনসিএর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৫ মিলিয়ন ডলার ফ্রিজ বা জব্দে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া, অর্থের উৎস ও বিদেশে স্থানান্তরের পদ্ধতি তদন্ত না করা এবং অর্থপাচারের অভিযোগে ব্যবস্থা না নেওয়াকে কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না— তা জানতে চেয়ে রুল জারির আবেদন করা হয়।

একইসঙ্গে সময়মতো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও চাওয়া হয়।

শুনানি শেষে হাই কোর্ট বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। পাশাপাশি দুদকে করা আবেদনটি ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।

আইনজীবী সানজিদ সিদ্দিকীর ভাষ্য, বিএফআইইউর নিষ্ক্রিয়তার কারণেই ২৫ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে ফেরত আনার সুযোগ নষ্ট হয়েছে। এখন আদালতের রুলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার পথ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন