সাঙ্গু নদীর ভাঙন যেন কিছুতেই থামছে না। বছরের পর বছর নদীর করাল গ্রাসে বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের মানচিত্র। বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়কসহ বিভিন্ন স্থাপনা হারানোর পর এবার ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে নদী তীরের বেড়িবাঁধও।
ইতোমধ্যে ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝের ঘাট এলাকায় এক কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ ভাঙনের মুখে পড়েছে। গত দুই সপ্তাহের ভাঙনে বাঁধের দুটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট অংশেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ফাটল।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় পুরো বাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়তে পারে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও মৎস্যঘেরে।
স্থানীয়দের দাবি, গত দুই দশকে সাঙ্গু নদীর ভাঙনে জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের ১০ হাজারের বেশি মানুষ বসতভিটা হারিয়েছেন। বিলীন হয়েছে শত শত একর ফসলি জমি। নদীভাঙনে ইউনিয়নের আয়তন ও জনপদের চেহারাও বদলে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাঝের ঘাট এলাকায় বেড়িবাঁধের বড় একটি অংশ নদীর দিকে ধসে গেছে। বাঁধের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অবশিষ্ট অংশে ফাটল দেখা দেওয়ায় সেটিও যে কোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাঁধটি ভেঙে গেলে শুধু বসতবাড়িই নয়, স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কয়েক শত একর কৃষিজমি এবং মৎস্যঘের জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন কৃষক ও মৎস্যচাষিরা।
স্থানীয় কৃষক কবির আহমদ বলেন, ‘নদী ভাঙনে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। গত ২০ বছরে জুঁইদণ্ডী ভাঙতে ভাঙতে অনেক ছোট হয়ে গেছে। এলাকার শত শত মানুষ বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত বাঁধ নির্মাণ করে দেওয়া হোক।’
জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোরশেদুর রহমান চৌধুরী খোকা বলেন, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝের ঘাট এলাকার বেড়িবাঁধ বর্তমানে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। গত দুই সপ্তাহে ভাঙনে বাঁধের দুটি অংশ নদীতে চলে গেছে। অবশিষ্ট অংশেও বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো মুহূর্তে পুরো বাঁধ বিলীন হয়ে যেতে পারে। বাঁধ ভেঙে গেলে স্থানীয় মৎস্যচাষিদের মাছের ঘের ও কয়েক শত একর ফসলি জমি জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাবে। এ এলাকার ১০ হাজারের বেশি মানুষের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে দ্রুত বাঁধ সংস্কার করা প্রয়োজন।’
পুরোনো ভাঙনের ক্ষত, নতুন করে শঙ্কা
জুঁইদণ্ডীর বেড়িবাঁধের এই সংকট নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে শঙ্খ নদীর ভাঙনে ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে জুঁইদণ্ডীর প্রায় চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধে ভাঙনের কথা উঠে আসে।
তখনও দ্রুত সংস্কার না করা হলে লোকালয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল এবং প্রায় ১০ হাজার মানুষকে ঝুঁকিতে থাকার কথা বলা হয়েছিল।
২০২৫ সালের মে মাসেও জুঁইদণ্ডীর নাপিত খাল এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে কৃষিজমি ও মৎস্যঘের প্লাবিত হয়। একই সময়ে রব্বাত মিয়ার বাড়ি থেকে মৌলি বাজার পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধ নদীভাঙনে বিলীন হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়।
এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জুঁইদণ্ডীর একাধিক এলাকায় শঙ্খ নদীর ভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক ও অন্যান্য স্থাপনা বিলীন হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
১৫০ কোটি টাকার প্রকল্প, তবু জরুরি জিও ব্যাগ
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের শঙ্খ নদী এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শাহীদ বলেন, ‘বর্তমানে জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে ভাঙন এলাকা আমরা পরিদর্শন করেছি। ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ বসানোর কাজ শুরু করা হবে।’
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন— দীর্ঘমেয়াদি টেকসই বাঁধ নির্মাণের কাজ চললেও বর্তমান ভাঙন ঠেকাতে জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা কত দ্রুত নেওয়া হবে? কারণ বাঁধটি নদীগর্ভে চলে গেলে কোটি কোটি টাকার কৃষি ও মৎস্যসম্পদ রক্ষার সুযোগও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কাজের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে দ্রুত জিও ব্যাগ, ব্লকসহ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে বাঁধটি রক্ষা করতে হবে। তা না হলে ১৫০ কোটি টাকার টেকসই বাঁধ নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই নদীর ভাঙনে হারিয়ে যেতে পারে জুঁইদণ্ডীর আরও বিস্তীর্ণ জনপদ।













