২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক বছরের ব্যবধানে একাধিক অভিযান ও জরিমানা; খাদ্যমান, পরিচ্ছন্নতা ও মাননিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন

হাইওয়ে সুইটসে একের পর এক অনিয়ম— মিষ্টির শিরায় তেলাপোকা থেকে মানহীন ঘি

চট্টগ্রামের ব্যপক পরিচিতি পাওয়া মিষ্টি ও বেকারি প্রতিষ্ঠান ‘হাইওয়ে সুইটস’। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির শাখা ও আউটলেট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসা এই প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিয়ে ভোক্তাদের একটি বড় অংশের আস্থা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক সরকারি অভিযানে উঠে এসেছে খাদ্য নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।

২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হাইওয়ে সুইটসের বিভিন্ন শাখা ও কারখানায় পরিচালিত একাধিক অভিযানে পাওয়া গেছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ, লেবেলিং ও মেয়াদসংক্রান্ত অনিয়ম, মিষ্টির সিরায় তেলাপোকা এবং সর্বশেষ মানহীন ঘি ব্যবহার, অপরিষ্কার পাত্র, স্যাঁতসেঁতে মেঝে ও তেলাপোকার বিচরণ।

সর্বশেষ গত ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে লালখান বাজারের হাইওয়ে সুইটস অ্যান্ড বেকারিতে এসব অনিয়ম ধরা পড়ে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশে দৃশ্যমান কিছু উন্নতি হলেও খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বেশ কিছু অসঙ্গতি তখনও রয়ে গেছে।

জানা গেছে, ১৯ সেপ্টেম্বরের অভিযানে লালখান বাজারের হাইওয়ে সুইটস অ্যান্ড বেকারিতে গিয়ে কর্মকর্তারা মিষ্টি তৈরিতে মানহীন ঘি ব্যবহারের বিষয়টি শনাক্ত করেন। একই সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়া টোস্ট-বিস্কুট বিক্রি, ছানা প্রক্রিয়াকরণের পাত্র অপরিষ্কার থাকা, স্যাঁতসেঁতে মেঝে এবং প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশে তেলাপোকার বিচরণ দেখতে পান।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মহানগরের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারহান ইসলামের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ২৬ ধারায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

তবে একই অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগের তুলনায় পরিবেশে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। ফলে সর্বশেষ অভিযানকে শুধু ‘আগের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। বরং প্রশ্নটি দাঁড়ায়- উন্নতি হওয়ার পরও কেন খাদ্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধাপে একই ধরনের স্বাস্থ্যবিধি ও মাননিয়ন্ত্রণের ঘাটতি রয়ে গেল?

এই প্রশ্নের পেছনে রয়েছে ২০২৫ সালের একটি আলোচিত অভিযান। ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে লালখান বাজারের হাইওয়ে সুইটসে মিষ্টির সিরায় তেলাপোকার পাখাসহ বিভিন্ন পোকামাকড় পাওয়া যায়। অভিযানের সময় মিষ্টির সিরায় তেলাপোকা ভাসতে দেখা যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ঘটনাটি শুধু একটি খাদ্যপণ্যে পোকামাকড় পাওয়ার কারণে আলোচনায় আসেনি; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল উৎপাদনস্থলের পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন। কারণ মিষ্টির মতো সরাসরি ভোগ্য খাদ্যের সিরায় পোকামাকড় পাওয়া গেলে সেই খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবেশন ব্যবস্থার ওপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।

এর প্রায় দশ মাস পর, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের অভিযানে একই প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশে আবার তেলাপোকার বিচরণ দেখতে পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। দুই ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও বিষয়টি খাদ্য উৎপাদনস্থলের পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর- সেই প্রশ্নকে সামনে আনে। শুধু লালখান বাজার নয়, ২০২৫ সালের নভেম্বরে হাইওয়ে সুইটসের অন্য একটি আউটলেটেও অভিযান চালানো হয়েছিল।

২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর হালিশহরের বড়পোল এলাকায় হাইওয়ে সুইটস অ্যান্ড বেকারির একটি আউটলেটে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অসম্পূর্ণ লেবেলিং, মেয়াদে কারচুপি, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যপণ্য মজুদের তথ্য পাওয়া যায়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অর্থাৎ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসেই প্রতিষ্ঠানটির দুই ভিন্ন স্থানে দুটি পৃথক সরকারি অভিযানে ভিন্ন ধরনের অনিয়মের তথ্য সামনে আসে- একটিতে মিষ্টির সিরায় তেলাপোকা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অন্যটিতে মেয়াদসংক্রান্ত কারচুপি ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য সংরক্ষণের অভিযোগ।

এগুলো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কি না, নাকি পৃথক আউটলেটের ব্যবস্থাপনার সমস্যা- তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব নথি ও সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর ব্যবস্থাপনা কাঠামো আরও যাচাই করা প্রয়োজন। তবে ভোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাগুলো একই ব্র্যান্ডের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করার মতো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ অভিযানের প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে- কর্তৃপক্ষ আগের তুলনায় পরিবেশের দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষ্য করেছে। এটি হাইওয়ে সুইটসের জন্য ইতিবাচক একটি তথ্য। কিন্তু একই অভিযানে যখন মানহীন ঘি, অপরিষ্কার ছানা তৈরির পাত্র, স্যাঁতসেঁতে মেঝে ও তেলাপোকার উপস্থিতি ধরা পড়ে, তখন বোঝা যায় যে উন্নতির পাশাপাশি কিছু মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে।

খাদ্য উৎপাদনে পরিচ্ছন্নতা কেবল চোখে দেখার মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কাঁচামালের মান, পাত্র-সরঞ্জাম পরিষ্কার রাখা, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য সংরক্ষণ, উৎপাদনস্থলের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, লেবেলিং ও মেয়াদ ব্যবস্থাপনা- সবগুলোই খাদ্য নিরাপত্তার অংশ।

সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) অনলাইন রেকর্ডেও হাইওয়ে সুইটসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া যায়। লালখান বাজারের মেসাস্ হাইওয়ে সুইটস এন্ড কনফেকশনারিকে ‘মিষ্টান্ন কারখানা’ হিসেবে নিবন্ধিত দেখানো হয়েছে। রেকর্ড অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ৬৭৮, হাইওয়ে মার্কেট, লালখান বাজার, খুলশী, চট্টগ্রাম এবং সেখানে ৬০ জনের বেশি শ্রমিকের তথ্য রয়েছে। আবার নগরের জামাল খান রোড ও এইচ এম রোডের হাইওয়ে সুইটস নামের পৃথক প্রতিষ্ঠানেরও সরকারি নিবন্ধন তথ্য রয়েছে। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন থাকা এবং প্রতিদিন উৎপাদিত খাবার নির্ধারিত মানে তৈরি হচ্ছে- এ দুটি এক বিষয় নয়। নিবন্ধন ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক ও শ্রম-সংক্রান্ত বৈধতার একটি দিক নির্দেশ করতে পারে; খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নির্ভর করে নিয়মিত মাননিয়ন্ত্রণ, পরিদর্শন, পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মেনে চলার ওপর।

সর্বশেষ অভিযানে কর্তৃপক্ষ মানহীন ঘি ব্যবহারের কথা বলেছে। কিন্তু ঘি-তে ঠিক কী ধরনের উপাদান ছিল, কোন মানদণ্ডে সেটিকে মানহীন বলা হয়েছে বা কোনো পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে কি না- এসব তথ্য জানতে হাইওয়ে সুইটস কর্তৃপক্ষের কেউ মন্তব্য করতে নারাজ।

আরও পড়ুন