দীর্ঘ ৩৬ দিনের অচলাবস্থার পর চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সীমিত পরিসরে শুরু হয়েছে একাডেমিক কার্যক্রম। বুধবার নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের তিনটি ব্যাচের ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি ১১টি বিভাগে ক্লাস শুরু হয়নি।
এদিকে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট নিরসনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি। সব পক্ষের বক্তব্য শুনে পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারকে সুপারিশ দেওয়ার কথা জানিয়েছে কমিটি। তবে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
বুধবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ২১, ২২ ও ২৩ ব্যাচের ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। তবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। রুটিন অনুযায়ী ল্যাব ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়।
বিভাগটির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ তালবী বলেন, স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস হয়েছে। রুটিন অনুযায়ী ল্যাব ক্লাস থাকার কথা থাকলেও বিভাগে আলোচনা করে তা স্থগিত করা হয়েছে।
বিভাগীয় প্রধান ফৌজিয়া গুলশানা রশিদ লোপা বলেন, তিনটি ব্যাচেরই ক্লাস হয়েছে। তবে উপস্থিতি কম ছিল। ২১ ও ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি শিক্ষার্থী ক্লাসে ফিরবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হলেও উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের অবসান হয়নি। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অবস্থান, ক্লাস চলার পাশাপাশি দাবি আদায়ে আন্দোলনও অব্যাহত থাকবে।
শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম মুর্শেদ রাতুল বলেন, শুরু থেকেই তাঁরা অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে অনড় রয়েছেন। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও একই দাবিতে আন্দোলন করছেন। ইউজিসির পরামর্শক কমিটির সঙ্গে বৈঠকেও তাঁদের এই অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
চুয়েটের অচলাবস্থা নিরসনে গঠিত ইউজিসির ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। পরে দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন কমিটির সদস্যরা। বিকেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য শোনার কর্মসূচিও ছিল।
কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন। সদস্যসচিব ইউজিসির অতিরিক্ত পরিচালক মো. মহিবুল আহসান। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী।
শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে চলমান পরিস্থিতি ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক রাশিদুল হাসান।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের বক্তব্য মৌখিকভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি লিখিত নথিপত্রও কমিটির কাছে দেওয়া হয়েছে। কমিটি এসব বক্তব্য শুনেছে। আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো সরকারের উচ্চপর্যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানানো হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। এর মধ্য দিয়ে অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত আসবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
বৈঠক শেষে ইউজিসির সদস্য ও পরামর্শক কমিটির প্রধান অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, চুয়েটের চলমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজতেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রথম দিনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্যও শোনা হবে। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করবেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ছাত্রদলের ছয় থেকে সাতজন নেতাকর্মী পরামর্শক কমিটির সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইন।
পরে সাংবাদিকদের ওয়াসিফ রাশেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণে তাঁরা কাজ করেন। উপাচার্য নিয়োগ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও একটি সার্বিক প্রক্রিয়ার বিষয়। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে তাঁরা প্রতিপক্ষ হিসেবে আসেননি; অচলাবস্থা নিরসনে নিজেদের মতামত তুলে ধরতেই কমিটির সঙ্গে দেখা করেছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে আসা কয়েকজনকে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন একাডেমিক গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়েও তাঁরা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটে নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর থেকেই প্রতিবাদে নামেন শিক্ষার্থীরা। পরদিন শুরু হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ ৩৬ দিনের অচলাবস্থার পর বুধবার একটি বিভাগে সীমিত পরিসরে ক্লাস শুরু হলেও উপাচার্যকে কেন্দ্র করে বিরোধের অবসান হয়নি। এখন ইউজিসির পরামর্শক কমিটির মতবিনিময় ও সুপারিশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করতে সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।














