এইচএসসি পরীক্ষায় ৩৬০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ৮২ জন। পাসের হার ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এমন হতাশাজনক ফলাফলের পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ফেরাতে স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে চট্টগ্রামের রাউজানের ইমাম গাজ্জালী (ডিগ্রি) কলেজ কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে নির্ধারিত ইউনিফর্ম ও পরিচয়পত্র ছাড়া ক্যাম্পাসে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এসব নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে। গত সোমবার কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবদুল জব্বার চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
কলেজ কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাটন ফোন ছাড়া কোনো স্মার্টফোন শিক্ষার্থীদের কাছে পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত পোশাক ও পরিচয়পত্র ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
কলেজের এবারের এইচএসসি ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩৬০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৮২ জন। কেউ জিপিএ-৫ পাননি। পাসের হারে রাউজানের ১৩টি কলেজের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ১২তম।
কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল জব্বার চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন আসক্তি এবারের খারাপ ফলাফলের অন্যতম প্রধান কারণ। অনেকেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে মনোযোগ না দিয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। পড়াশোনা ও তথ্য সংগ্রহে স্মার্টফোনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও শিক্ষার্থীরা এর অপব্যবহার করছে। এইচএসসি পর্যন্ত, বিশেষ করে ১৮ বছরের কম বয়সীদের স্মার্টফোন ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
অধ্যক্ষ জানান, গত সোমবার একাদশ শ্রেণির ক্লাস থেকে ২৫টি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা ফোনগুলোর কয়েকজন মালিকের কাছে বই নেই, বই কেনার সামর্থ্যও নেই; অথচ তাদের হাতে রয়েছে দামি স্মার্টফোন। শিক্ষার্থীরা বই নিয়ে নিয়মিত ক্লাসে এলে জব্দ করা ফোনগুলো অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ফোন জব্দের পর স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা সেগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য তাঁকে ফোন করেছেন বলেও জানান অধ্যক্ষ।
ফল বিপর্যয়ের পেছনে নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এইচএসসিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন অধ্যক্ষ। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরই চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাপের মুখে ছয় বিষয়ে অকৃতকার্য এক শিক্ষার্থীসহ অনেককে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হয়েছে।
এ ধরনের রাজনৈতিক চাপ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মুক্ত রাখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কলেজের নির্দেশনা অনুযায়ী, ছাত্রদের জন্য সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। ছাত্রীদের পরতে হবে সাদা থ্রি-কোয়ার্টার অ্যাপ্রোন, সাদা সালোয়ার-কামিজ ও সাদা ওড়না। তবে বোরকা পরিহিত ছাত্রীদের ক্ষেত্রে ইউনিফর্মের শর্ত শিথিলযোগ্য রাখা হয়েছে। এসব নির্দেশনা অমান্য করলে ক্যাম্পাসে প্রবেশের সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বুধবার (৪ নভেম্বর) এসএসসি পরীক্ষার মূল নম্বরপত্র কলেজ অফিসে জমা দিতে বলা হয়েছে।
কলেজের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের অনেকে। অ্যাডভোকেট ফরহাদ উদ্দিন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের আসক্তি ও অপব্যবহার কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবারের সচেতনতা ও অভিভাবকদের তদারকি জরুরি। প্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন থেকে পুরোপুরি দূরে না রেখে এর সঠিক ব্যবহার শেখানোও প্রয়োজন।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইমাম গাজ্জালী ডিগ্রি কলেজটি রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সম্মুখে অবস্থিত। দীর্ঘদিনের এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক ফলাফল শিক্ষার মান ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্মার্টফোন নিষিদ্ধ, ইউনিফর্ম ও পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের জবাবদিহি, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। তবেই ফিরতে পারে শিক্ষার পরিবেশ, উন্নত হতে পারে ফলাফল।













