সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার»
রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতায় পরিণত হওয়া মাস্টার মুহিবুল্লাহকে (৫০) হত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে উগ্রবাদী রোহিঙ্গা সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা)। শনিবার (২ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে সশস্ত্র এ গোষ্ঠীর মুখপাত্র মৌলভি শোয়েব এ দাবি করে বলেছেন, ‘মিয়ানমার সরকারের এজেন্টরাই মুহিবুল্লাহ হত্যায় জড়িত।
বৃহস্পতি ও শুক্রবার আরসা’র কমান্ডার ইন চিফের পক্ষে অডিও এবং লিখিত দুটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এক বিবৃতিতে এ গোষ্ঠীর মুখপাত্র মৌলভি শোয়েব বলের, এ খুনের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং এটা একে অপরকে ভিত্তিহীনভাবে দোষারোপের সময় নয়। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরসা কোনোভাবেই জড়িত নয়।
অডিও বার্তায় আরসার পক্ষে মৌলভি শোয়েব আরো বলেন, আমাদের ভাই মাস্টার মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার বিচার নিয়ে কাজ করছিলেন। পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার প্রচেষ্টা ছিল অসাধারণ। এমন একজন রোহিঙ্গা নেতাকে হত্যা রোহিঙ্গা জাতির জন্য বড় ক্ষতি।
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগেও মে মাসের ১৫ তারিখে আরেক রোহিঙ্গা নেতা শওকত আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ দুই নেতার হত্যা নিয়ে আরসা অত্যন্ত মর্মাহত ও ব্যথিত।’
অন্যদিকে, আরসা কমান্ডার ইন চিফ আবু আম্মদ জুনুনী লিখিত বিবৃতিতে মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সীমান্তকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কিন্তু, বৃহস্পতিবার কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গের সামনে নিহতের ভাই হাবিবুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, এ হত্যার পেছনে কথিত বিতর্কিত সংগঠন আরসা সন্ত্রাসীরা জড়িত। কিন্তু ওইদিন রাতে উখিয়া থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে হত্যা মামলায় কাউকে আসামি না করে কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রুপের কথা বলা হয়েছে।
ওই হত্যার ঘটনায় শনিবার ভোর রাতে এপিবিএনের একটি টিম উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে ১ ইস্ট লম্বাশিয়া ক্যাম্প থেকে আব্দুস সালাম (৩০) এবং ৮ ইস্ট কুতুপালং ক্যাম্প থেকে জিয়াউর রহমান (৩২) নামে দুজনকে আটক করেছে।এর আগে, শুক্রবার দুপুরের দিকে এপিবিএনের সদস্যরা সেলিম উল্লাহ ওরফে লম্বা সেলিম (২৭) নামে আরো একজনকে আটক করেছিলো। পরে তাদের সবাইকে উখিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন ১৪ এপিবিএন অধিনায়ক ও পুলিশ সুপার মো. নাইমুল হক।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহমেদ সনজুর মোরশেদ জানান, শুক্রবার দুপুরে একজন ও শনিবার ভোরে দুজন মিলে এ পর্যন্ত তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বুধবার রাত পৌনো ৯টার দিকে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা মুহিবুল্লাহর নিজ অফিসে ৫ রাউন্ড গুলি চালায়। এ সময় তিন রাউন্ড গুলি তার বুকে লাগে। এতে মুহিবুল্লাহ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। পরে এপিবিএন সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে ‘এমএসএফ’ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রোহিঙ্গা নেতা মুহিব্বুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জেলা পুলিশ ও এপিবিএনের টহল বাড়ানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন ১৪ এপিবিএনর অধিনায়ক পুলিশ সুপার নাঈমুল হক।
বৃহস্পতিবার রাতে রোহিঙ্গা নেতা মুহিববুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই হাবিব উল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জনকে আসামি করে থানায় মামলা (মামলা নং-১২৬/২১) দায়ের করেন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা ২৭ আন্তর্জাতিক সংগঠনের বিবৃতি:-

এদিকে মুহিবুল্লাহকে হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে ২৭টি আন্তর্জাতিক রোহিঙ্গা সংগঠন। যৌথ বিবৃতিতে এ ঘটনায় ক্যাম্পগুলোর পরিস্থিতি আরও নাজুক ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনগুলোর কর্তা ব্যক্তি।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে, আরাকান রোহিঙ্গা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন-অস্ট্রেলিয়া, আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (এআরএনও), অস্ট্রেলিয়ান বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন, ব্রিটিশ রোহিঙ্গা কমিউনিটি ইন ইউকে, বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন-জাপান, কানাডিয়ান বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন, ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিল (ইআরসি), রোহিঙ্গা অ্যাকশন আয়ারল্যান্ড, রোহিঙ্গা আমেরিকান সোসাইটি এবং রোহিঙ্গা সোসাইটি মালয়েশিয়া।
প্রসঙ্গত, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমনপীড়নের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। বর্তমানে নতুন ও পুরনো মিলে কক্সবাজারের ৩৩টি রোহিঙ্গা শিবির এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে বসবাস করছেন প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস













