৭ নভেম্বর ২০২৬

পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়না

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে নিহতের ঘটনায় পুলিশী আইন ও পরিবেশ আইনের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। আইনী দ্বন্ধ থাকায় পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে কখনো কোন হত্যা মামলার নজির নেই থানায় বা আদালতে। সিএমপির খুলশী ও বায়েজিদ থানাসহ তিন পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়খেকোদের থাবা থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না পরিবেশের মূল ভারসাম্য রক্ষাকারী পাহাড়। শুধু চট্টগ্রামের খুলশী ও বায়েজিদ থানাই নয় বিভিন্ন সময়ে বান্দরবানের লামা ও কক্সবাজারের মহেশখালি থানায় প্রায় অর্ধশত অপমৃত্যু মামলা রয়েছে। যেসব অপমৃত্যুর মূল কারণ পাহাড়ের মাটি ধস। মানব সৃষ্ট এসব ধস ও ধসকারীর বিরুদ্ধে আইনের কোন শক্তিশালী ধারাও নেই।

অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পূর্ণবাসনের নামে জেলা প্রশাসনের সম্বিলিত কমিটি থাকলেও তা অকার্যকর হয়ে থাকে সারা বছর। পাহাড় কর্তনের মাধ্যমে যারা পাহাড়ের পাদদেশে ভাড়া বাণিজ্য ও ভূমি বাণিজ্য চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়না প্রশাসন। এদিকে, পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে কোন ধরনের মামলা দায়ের না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। অপরদিকে, ২০১২ সালে খুলশী থানাধীন আকবর শাহ মাজার এলাকায় ধসে যাওয়া নগরীর পাহাড়ের পাদদেশ থেকে এসব পরিবারকে সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ করেছিল তারা আবার বহাল তবিয়তে। উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সকল উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা দেয়া হয় ঠিকই তা মৌসুম শেষে আবার ভেস্তে যায়।

জানা গেছে, আকবরশাহস্থ রেলের মালিকানাধীনে থাকা পাহাড়ের মাটি কেটে ভূমি বাণিজ্য ও ভাড়া বাণিজ্য চলে ভূমিদস্যুদের। পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণ ও ভাড়া দেয়ার কারণেই অতি বৃষ্টিতে ধসে পড়ে পাহাড়ের কয়েকটি অংশ। এসব এলাকায় উদ্ধার অভিযান শেষে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা লোকজনকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয় প্রতি বর্ষা মৌসুমের আগে। কিন্তু কোন লাভ হয়না। প্রশাসনের ঢিলেমির কারনে স্বউদ্যোগে সরে না গেলে তাদেরকে উচ্ছেদ করা হবে বলে প্রশাসনের এমন ঘোষণার পরও কোন সুরাহা পাওয়া যায় না।

আরো অভিযোগ উঠেছে, পাহাড় ধসের পেছনে মুল কারণ হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে মাটি কেটে ভূমি দখলের অপচেষ্টা। ভূমিদস্যুরা রাজনৈতিক ও পেশী শক্তি ব্যবহার করে সরকারি পাহাড় দখলে নিয়ে যুগ যুগ ধরে ভাড়া বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। এসব পাহাড় কাটার পেছনে যে সিন্ডিকেট রয়েছে এরমধ্যে পুলিশেরও সম্পৃক্ততা থাকায় ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থরা বিচার দাবি করতে পারছেনা থানা পুলিশের কাছে। পুলিশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখিয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ধসের ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে।

পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে জানা গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও এ দুর্যোগ পরিকল্পিত। পুলিশ ব্যাপক হারে নিহতের ঘটনায় ভূমিদস্যুদের সংশ্লিষ্টতা দেখিয়ে মামলা দায়েরের যুক্তি রয়েছে। তবুও পুলিশের কারণেই রেহাই পাচ্ছে এসব অসাধুরা। পাহাড় কর্তন ও পাহাড়ের পাদদেশ ছাটাই করার পেছনে রয়েছে ভূমিদস্যুতা। তদন্ত সাপেক্ষে এসব পাহাড় কর্তনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল ও সহযোগী হিসেবে ব্যবহার হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইন ২০১০ এর বিধান অনুযায়ী মামলা দায়ের হওয়ার কথা থাকলেও তা নিস্প্রাণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের মাটি ধস এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও ভূমিদস্যুদের পরিকল্পিত ঘটনা। এ ঘটনায় পুলিশী আইনে হত্যা মামলা হওয়া উচিত। অপমৃত্যু মামলা হওয়ার কোন সুযোগ নেই। যেহেতু পুলিশ জানে কারা এ ঘটনার মূল হোতা সেহেতু তাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। কিন্তু তা করছে না মেট্রো আইনের দোহাই দিয়ে।

অপরদিকে, খুলশী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানা গেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেই অপমৃত্যু মামলা দায়ের হচ্ছে। ২০১২ সালে আকবরশাহর ঘটনায় ৪টি ও বিশ্ব কলোনীর ঘটনায় ২টি অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়েছে। এর পর আর চোখে পড়ার মত কোন মামলা নেই। এদিকে, তিন পার্বত্য জেলার লামা, উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি ও মহেশখালিসহ বিভিন্ন থানায় পাহাড় ধসের ঘটনায় নিহত হলেও অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়। যা তদন্তে পর আর কিছুই থাকেনা অপরাধীদের ধরতে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদফতর পাহাড় কর্তনকারী ও ভাড়া আদায়কারীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে পারে। হত্যা মামলা হওয়ার কোন সুযোগ নেই। যদিও পাহাড় ধস প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু এ ধরনের ধস পরিকল্পিত কর্মকান্ডেরই ফল। ৩০৪ (খ) ধারায় অবহেলাজনিত কারণেই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশনা রয়েছে পুলিশী বিধানে। কারণ ভূমিদস্যুরাই নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য পাহাড় কেটে ও ভাড়া দিয়ে এ সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ