একটি ছেলে নিখোঁজ হয়েছে। একদিন-দুইদিন নয়— কেটে গেছে সাড়ে সাত বছর। এই দীর্ঘ সময়ে ছেলেটি কোথায় ছিল, কী অবস্থায় ছিল, তার সঙ্গে কী ঘটেছে— কিছুই জানে না পরিবার। জানে না সে বেঁচে আছে, নাকি তার জীবনের গল্প শেষ হয়ে গেছে কোনো অন্ধকার গহ্বরে। শুধু জানেন একজন— তার মা।
আজও দরজা খুললে হোসনে আরা বেগমের চোখ খোঁজে সেই পরিচিত মুখ। রাত গভীর হলে তাঁর মনে হয়, হয়তো কোনো একসময় দরজায় কড়া নাড়বে ছেলে জাহিদ হাছান। হয়তো বলবে, ‘মা, আমি ফিরে এসেছি।’ কিন্তু সেই অপেক্ষার রাত আর শেষ হয় না।
২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৩টা। কর্ণফুলী উপজেলার ইছানগর এলাকায় তাঁর খালার বাড়িতে ছিলেন ১৮ বছরের তরুণ মো. জাহিদ হাছান। পরিবারের অভিযোগ, গভীর রাতে দুইটি মাইক্রোবাসে করে ৮ থেকে ১০ জন লোক সেখানে আসে। তারা নিজেদের প্রশাসনের লোক বলে পরিচয় দেয়।
এরপর জাহিদকে ডেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে নেওয়া হয় তাঁর খালাতো ভাই ফয়সালকেও। পরিবারের সদস্যরা পরিচয় জানতে চাইলে কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় না দিয়ে প্রশাসনের লোক পরিচয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুই তরুণকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায় তারা।
ফয়সালকে কয়েক ঘণ্টা পর নামিয়ে দেওয়া হলেও জাহিদকে আর ফেরত দেওয়া হয়নি। সেই রাতের পর থেকে জাহিদ যেন হারিয়ে গেলেন পৃথিবীর মানচিত্র থেকেই।
নিখোঁজের দুই দিন আগে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত অসীম
জাহিদের নিখোঁজ হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে, ২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামের মুরাদপুরে র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন নগরীর ব্যবসায়ী অসীম রায় বাবু। পরিবারের দাবি, অসীমের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছিলেন জাহিদ। আর মুরাদপুরের ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলেন তিনি। ঘটনার পর জাহিদ স্থানীয় সিপ্লাস টিভি ও সময় টিভিতে বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে জানায় তাঁর পরিবার।
তারপরই ঘটে সেই ঘটনা— ১২ অক্টোবর অসীম নিহত, ১৪ অক্টোবর গভীর রাতে জাহিদ নিখোঁজ। এই সময়ের ব্যবধানই জাহিদের পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে আছে। তাঁদের অভিযোগ, অসীমের মৃত্যুর ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার কারণেই জাহিদকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে তাকে কারা তুলে নিয়েছিল, কেন নিয়েছিল, কোথায় নিয়ে গিয়েছিল— এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর আজও মেলেনি।
‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয় দেওয়া সেই ৮-১০ জন কারা?
জাহিদের বড় ভাই মেহেদী হাসান বিপ্লব ও মা হোসনে আরা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন রাতের অভিযানে আসা ব্যক্তিদের কারও মুখে মুখোশ ছিল না। তাদের পরনে ছিল গেঞ্জি ও জিন্সের প্যান্ট। কোমরে অস্ত্রও ছিল বলে দাবি পরিবারের। দুটি গাড়ি— একটি সাদা এবং অন্যটি কালো পাজেরো।
পরিবারের সদস্যরা পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের প্রশাসনের লোক বলে দাবি করে। কিন্তু কোন বাহিনী, কোন ইউনিট কিংবা কোন কর্মকর্তার নির্দেশে তারা এসেছিল—তার কোনো উত্তর দেয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের।
প্রশ্ন হচ্ছে— কর্ণফুলী থানার আওতাধীন একটি এলাকা থেকে যদি সত্যিই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা একজন তরুণকে তুলে নিয়ে থাকেন, তাহলে তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছিল? কোন মামলায় বা কোন অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল?
তাকে থানায় নেওয়া হয়নি কেন? কোনো গ্রেপ্তারি নথি তৈরি হয়েছিল কি না? আর যদি তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য না হয়ে থাকে, তাহলে এত বছরেও সেই ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেল না কেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আজও খুঁজছে জাহিদের পরিবার।
ফয়সাল ফিরলেন, জাহিদ ফিরলেন না
সেদিন জাহিদের সঙ্গে তাঁর খালাতো ভাই ফয়সালকেও তুলে নেওয়া হয়েছিল। পরিবারের ভাষ্য, কয়েক ঘণ্টা পর নগরীর আসগরদীঘির পাড় এলাকায় ফয়সালকে নামিয়ে দেওয়া হয়। যাওয়ার সময় তাঁর হাতে দেওয়া হয় মাত্র ২০ টাকার একটি নোট। কিন্তু জাহিদ? তাকে আর ফেরত দেওয়া হয়নি। একই গাড়িতে, একই রাতে, একই ব্যক্তিদের হাতে তুলে নেওয়া দুই তরুণের একজন ফিরে এলেন। অন্যজন আজও নিখোঁজ। এই বৈপরীত্যও পরিবারের কাছে এক গভীর রহস্য।
থানায় জিডি, র্যাবে অভিযোগ—তবুও নেই সন্ধান
জাহিদ নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর তাঁর বড় ভাই মেহেদী হাসান বিপ্লব কর্ণফুলী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নম্বর ৭২০। এরপর পরিবারের সদস্যরা একের পর এক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন দপ্তরে ছুটেছেন। থানায় গেছেন, ডিবি কার্যালয়ে গেছেন, র্যাবের কাছে গেছেন। জাহিদের মা হোসনে আরা বেগম র্যাব-৭-এর অধিনায়কের কাছেও লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ নম্বর ৭২৪।
পরিবারের দাবি, র্যাবের কাছে ২০ বারের বেশি গিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু কোনো জায়গা থেকেই মেলেনি জাহিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য। একজন মা বারবার একই প্রশ্ন নিয়ে সরকারি দপ্তরের দরজায় দাঁড়িয়েছেন— ‘আমার ছেলেকে কোথায় নিয়ে গেছে?’ সাড়ে সাত বছরেও সেই প্রশ্নের উত্তর নেই।
সরকার বদলেছে, ফিরেছেন অনেকে— জাহিদ কেন নয়?
গত সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা কয়েকজন ব্যক্তির ফিরে আসার ঘটনা সামনে আসে। তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন স্থানে বন্দি থাকার কথা জানিয়েছেন। এতে নতুন করে আশার আলো জ্বলে ওঠে জাহিদের পরিবারের মধ্যেও।
জাহিদের ভাই মেহেদী হাসান বিপ্লব বলেন, ‘বিগত সরকারের পতনের পর অনেকেই ফিরে এসেছেন। কিন্তু আমার ভাই ফিরে আসেনি। কোনো খবরও পাচ্ছি না।’ তিনি জানান, সম্প্রতি তাঁর মা কর্ণফুলী থানায় গিয়ে বিষয়টি জানিয়ে সহযোগিতা চেয়েছেন। জাহিদের সন্ধান চেয়ে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারিতেও লিখিত অভিযোগ করেছেন তারা। কমিশন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান তিনি।
‘রাষ্ট্রের কাছে আমাদের একটাই দাবি— জাহিদকে খুঁজে দিন’
জাহিদের পরিবার এখন আর কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ চায় না। তাঁদের চাওয়া খুব সাধারণ— একটি উত্তর। জাহিদ কোথায়? সে যদি বেঁচে থাকে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আর যদি না থাকে— তাহলে অন্তত তাঁর পরিবারের কাছে সত্যটি প্রকাশ করা হোক। কারণ অনিশ্চয়তার এই জীবনও এক ধরনের শাস্তি।
মা হোসনে আরা বেগম আজও জানেন না তাঁর ছেলের জন্য দোয়া করবেন, নাকি কবরের জন্য মাটি খুঁজবেন। তিনি জানেন না ছেলে কোথায় ঘুমায়। শুধু জানেন—তাঁর ছেলে একদিন বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, কিন্তু আর ফিরে আসেনি।
সাড়ে সাত বছর ধরে একই দরজা, একই অপেক্ষা
১৮ বছরের জাহিদ যখন হারিয়ে যান, তখন তাঁর সামনে ছিল পুরো জীবন। আজ তাঁর বয়স হলে প্রায় ২৬ বছর। এই সাত বছরে কত কিছু বদলে গেছে। বদলেছে সময়, বদলেছে সরকার, বদলেছে মানুষের জীবন। শুধু বদলায়নি হোসনে আরা বেগমের অপেক্ষা। আজও কোনো গাড়ির শব্দ শুনলে হয়তো তাঁর বুক কেঁপে ওঠে।
কোনো অপরিচিত মানুষ দরজার সামনে দাঁড়ালে হয়তো চোখ চলে যায় তার মুখের দিকে। হয়তো মনে হয়— এই বুঝি জাহিদ। কিন্তু প্রতিবারই ফিরে আসে শূন্যতা। একজন মায়ের কাছে সবচেয়ে কঠিন যন্ত্রণা হয়তো প্রিয়জনের মৃত্যু নয়— প্রিয়জন বেঁচে আছে কি না, সেটিও জানতে না পারা। সাড়ে সাত বছর ধরে সেই যন্ত্রণাই বয়ে বেড়াচ্ছে জাহিদের পরিবার।
আর তাই প্রশ্নটি এখন শুধু একটি পরিবারের নয়— ২০১৮ সালের সেই রাতে জাহিদ হাছানকে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল? কোথায় নিয়ে গিয়েছিল? এরপর তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি কখনো মিলবে? নাকি একটি মায়ের অপেক্ষার মতোই এই রহস্যও থেকে যাবে অন্ধকারে?














