১৮ অক্টোবর ২০২৬

কক্সবাজারে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড

রিসোর্টের দুই মালিকের নামে মামলা, ম্যানেজার গ্রেপ্তার

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেকে ‘টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশু ও শিক্ষার্থীসহ ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় রিসোর্টের দু’মালিক তানভীর আহমদ, নিয়াজ মোর্শেদ ও ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ম্যানেজার সুমনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও রিসোর্ট মালিক নিয়াজ মোর্শেদ ও তানভীর আহমদের অবস্থান এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রিসোর্টের রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, মামলায় মোট কতজনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে অনীহা প্রকাশ করেন ওসি।

উখিয়া থানার পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মামলায় প্রধান আসামি রিসোর্টের মালিক ও চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা তানভীর আহমদ। এছাড়া ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকেও আসামি করা হয়েছে। তবে মামলার অন্য আসামিদের নাম ওই কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেননি।

এদিকে লাশের পরিচয় শনাক্ত ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে ডিএনএ পরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান।

ডিসি বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার আগপর্যন্ত লাশগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হবে। উদ্ধার হওয়া লাশ, নিখোঁজ ব্যক্তি ও পরিচয় শনাক্তের বিষয়টি নিয়ে যেন কোনো বিভ্রান্তি না থাকে, সে জন্য ডিএনএ পরীক্ষার পরই লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এদিকে, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ইতোমধ্যে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কক্সবাজারে কর্মরত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে এখানেই ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।

পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পরই আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের ফোকাল পয়েন্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) অহিদুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলেও বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য জানান, প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। সেগুলো উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে; পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা প্রয়োজন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। এ ঘটনায় মোট ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং সাতজন আহত হন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিহতদের তালিকায় পরিচয় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ফাইজান আহম্মেদ, নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম।

আহতরা হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীর প্রায় ৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।

জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের এডিএমকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন জানান, টুপটুপ রিসোর্টের কউকের অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তার মতে, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান থাকায় অনুমোদন যাচাইয়ে সময় লাগছে। ইতিমধ্যে যাচাই করা আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে বৈধতা নিশ্চিত করতে নোটিশ দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষে চূড়ান্ত নোটিশ দেয়া হবে। এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান চলবে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, রিসোর্টটি ছাড়াও দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স না থাকায় নোটিশ দিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা শনিবার ঢাকায় থেকে এসেছে।

এদিকে, মরদেহগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। নিহত ও নিখোঁজদের স্বজনরা মর্গ এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। কেউ কেউ একটু পর পর নিরবে কাঁদছেন। ডিনএনএ স্যাম্পল ঢাকায় পৌঁছানোর সাথে সাথে যেন পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায় সেজন্য নিহতদের অভিভাবকরা ঢাকার মালিবাগের সিআইডি হেডকোয়ার্টারে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতাল এলাকায় থাকা স্বজনরা।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ