৮ নভেম্বর ২০২৬

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের পদত্যাগের হুমকি!

বাংলাধারা ডেস্ক  »

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পদত্যাগের হুমকিতে খুব বেশি হেরফের হচ্ছে না চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে। আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র রোববার (২৯ নভেম্বর) এই তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন দলের প্রবীণ নেতা, নীতি-নির্ধারণী ফোরামের প্রভাবশালী সদস্য। তাঁর হাত ধরে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের আজকের সুসংগঠিত অবস্থান। তার হাতেই তৈরি হয়েছে নেতৃত্বের বড় কাফেলা। কাজেই এমন একজন নেতার পাঠানো কমিটিকে কাটছাঁট কিংবা পদপদবীতে বড়ধরনের রদবদল প্রকারান্তরে তাকেই অসম্মান করার সামিল।

তারই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে হাইকমান্ডের কাছে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে নিজের অবস্থানের কথা জানিয়ে তার প্রস্তাবিত কমিটি পরিবর্তন করলে প্রয়োজনে পদত্যাগ করবেন এমন হুমকিও দিয়েছেন।

এর আগে গত বুধবার (২৪ নভেম্বর) চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালাম ও সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমানকে কেন্দ্রে জরুরি তলব করা হয়। ওদিন সন্ধ্যায় প্রায় দুইঘণ্টা ধরে যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের সাথে জেলার দুই শীর্ষ নেতার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উত্তর জেলার প্রস্তাবিত কমিটিতে নেতাদের অবনমন, ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের আনুগত্য ও বিশ্বস্তদের গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনা হয় এবং দলের ত্যাগী নেতাদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি করে কেন্দ্রে পাঠাতে বলা হয় জেলার শীর্ষ এই দুই নেতাকে। খবর: একুশে পত্রিকা

জানা গেছে, মূলত এরপর থেকে বেঁকে বসেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। পরিবর্তনের বিষয়টিকে ‘প্রেস্টিজ’ ইস্যু মনে করে কেন্দ্রকে স্পষ্টত জানিয়ে দিয়েছেন তার কমিটি কাটছাঁট হলে প্রয়োজনে তিনি দল ছাড়বেন। এ পরিস্থিতিতে হাইকমান্ড বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবছে-এমনই তথ্য দিয়েছে সূত্রগুলো।

সূত্র মতে, এ অবস্থায় হাইকমান্ড এখন দুইকূলই রুক্ষা করতে চাইছে। প্রস্তাবিত কমিটিতে যে যেই পদে আছেন সেভাবে রেখে সাথে বাদ পড়া ২-৩ জন ত্যাগী নেতাকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি প্রেরণের নতুন নির্দেশনা দেওয়ার কথাও ভাবছে কেন্দ্র। তবে যারা অন্তর্ভুক্ত হবেন ‘সদস্য’ ছাড়া সম্পাদকীয় পদে থাকার সম্ভাবনা তাদের খুব একটা নেই বলে জানা গেছে।

এর আগে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর সম্মেলনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন যথাক্রমে এম এ সালাম ও শেখ আতাউর রহমান। এর কিছুদিন পর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ৭৫ সদস্যের প্রস্তাবিত কমিটি অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে পাঠান।

সেসময় অভিযোগ ওঠে, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পছন্দ ও আনুগত্যের লোকগুলোই প্রস্তাবিত কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। কখনো রাজনীতি করেননি এমন লোকেরও ঠাঁই হয়েছে আওয়ামী লীগের বৃহত্তম ও শক্তিশালী এই ইউনিটে।

অন্যদিকে, আনুগত্যের প্রশ্নে যাদের নিয়ে সন্দেহ আছে, যোগ্যতা ও দলের জন্য আত্মত্যাগ সত্ত্বেও তাদের ঠাঁই হয়নি কমিটিতে। শুধু তা নয়, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের অপছন্দের লোকজন গত কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও প্রস্তাবিত কমিটিতে তাদেরকে এবারের কমিটিতে রাখা হয়নি। অপছন্দের কয়েকজনকে রাখা হলেও তাদেরকে অবনমন করা হয়েছে। পূর্বের কমিটিতে সহ সভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক পদে ছিলেন এমন নেতাকে রাখা হয়েছে স্রেফ ‘সদস্য’ পদে।

এ পরিস্থিতিতে পদবঞ্চিত নেতারা সেসময় দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তাঁর সংসদ ভবন কার্যালয়ে দেখা করে তাদের ক্ষোভ ও কষ্টের কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত কমিটির সাথে সংশ্লিষ্টদেরকে ভর্ৎসনা করেন এবং বাদপড়া ত্যাগীদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠনের আশ্বাস দেন।

এছাড়া উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীও কমিটির অসঙ্গতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতির কথা তুলে ধরে কেন্দ্রের কাছে একটি অভিযোগপত্র প্রেরণ করেন।

এসবের প্রেক্ষিতে ঝুলে যাওয়া কমিটি আগামি কয়েকদিনের মধ্যে ঘোষণা হতে পারে বলে জানা গেছে। অবশেষে সব অভিযোগ-অনুযোগ ছাপিয়ে একটা ‘ব্যালেন্স’ কমিটি অনুমোদনের দিকেই যাচ্ছে কেন্দ্র তা একপ্রকার নিশ্চিত।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমার হাতে ১০১টা ইউনিয়ন চলে, সেগুলোতে আমি যেভাবেই কমিটি দিয়েছি সেভাবেই হয়েছে। নেত্রীর নির্দেশে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেছি ভোটাভুটির মাধ্যমে। কিন্তু যারা এই কমিটিতে আসতে চাচ্ছে বা নেই তারা আমাকে মানছে না।’

তিনি বলেন, ‘তাদের যদি কোনো অভিযোগ অথবা প্রশ্ন থাকতো তাহলে তারা আমার কাছে আসতে পারতো, বৈঠক করে অন্যজনের কাছে ধর্ণা দেওয়ার কী দরকার? আমার সিদ্ধান্তে নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে আমি তা দেখতাম।’

কমিটি প্রসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনে মাইনাস-২ ফর্মুলার সাথে যারা জড়িত ছিল, যারা সেনাসমর্থিত সরকারের সাথে যোগাযোগ রেখেছিল তারা এখন ফ্রন্টলাইনার হতে চায়, আমি কি তাদের কমিটির শীর্ষ পদে আনতে পারি? যেটা করার সেটা আমি ভেবেচিন্তেই করেছি, রাজনীতির মঙ্গলের জন্যই করেছি। কে কী বললো, কোথায় বৈঠক করলো সেটা আমার দেখার বিষয় না।’

এসময় তাঁর দেওয়া উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে রদবদল হলে পদত্যাগের হুমকির বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘কমিটিতে পরিবর্তন আসলে কেউ পদত্যাগ করবেন এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে আসেনি। তবে অবশ্যই দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের প্রতি সম্মান রেখেই এই কমিটি করা হবে। তাদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া যৌক্তিক এবং সেটাকে আমরা বিবেচনায় রাখছি।’

তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী জেলার নির্বাচিত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং বিদায়ী সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক যৌথভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবে। যা কেন্দ্রে যাচাই-বাছাই করা হবে, কেন্দ্রের প্রয়োজনে সেখানে সংযোজন বা বিয়োজন করা হবে। এরপর দলীয় সভানেত্রী সেটার অনুমোদন দিবেন।’

এ প্রসঙ্গে প্রস্তাবিত কমিটিতে উপেক্ষিত বিদায়ী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইউনুস গণি চৌধুরী বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য একজন আইকনিক লিডার। আজ উত্তর জেলা আওয়ামী লীগকে এই অবস্থানে আনার পেছনে উনার অবদান অনস্বীকার্য। তবে শেষ মুহূর্তে এই কমিটি নিয়ে তিনি যে জেদটা ধরে আছেন তা খুবই দুঃখজনক। প্রয়োজনে তিনি আমাদের সাথে কথা বলতে পারতেন। আমাদের যদি বলতেন এই কমিটিতে আমাদের রাখবেন না তখন সেটাও আমরা মাথা পেতে নিতাম। তবে এখনও বলছি কেন্দ্র থেকে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আমি সেটা মেনে নিবো।’

বাংলাধারা/এফএস/এআর

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ