১৭ এপ্রিল ২০২৬

ওয়েল ফুড ‘সাফল্যের’ অন্ধকার গল্প! (১ম পর্ব)

কিছুতেই দমছে না ‘ওয়েল ফুড’! অথচ দেশের বিশুদ্ধ, ভেজালমুক্ত এবং স্বাস্থ্যসম্মত বেকারি ও ফাস্ট ফুড পণ্যের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের দাবিদার ‘ওয়েল ফুড লিমিটেড’।

২০০১ সালে প্রথম চট্টগ্রাম থেকেই যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগ্রুপ ওয়েল গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এটি। অল্প সময়ে নাম কুড়ানো এই প্রতিষ্ঠান অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনই নয়, ক্ষতিকর কেমিক্যাল দিয়ে খাদ্য উৎপাদন করে পণ্য বিক্রয় ও বিপণন করে আসছে ইদানীং। তাছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপন রেখে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাধারার হাতে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের পেছনে জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু অন্ধকার চিত্র।

মূলত প্রিমিয়াম মিষ্টি, নুডলস এবং বেকারি পণ্য তৈরি করে এবং ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানে আউটলেট পরিচালনা করে আসছে ওয়েল ফুড লিমিটেড। ভ্যাট অডিট কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটিকে অটোমেটেড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট মডিউল ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। পণ্য ক্রয়ের পর সেই হিসাবে ‘পস’ মেশিনের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ সম্পন্ন করেন ক্রেতারা, যেখানে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) সংযুক্ত থাকে। তারা জালিয়াতির মাধ্যমে ক্যাশ সেল গোপন করে ডাবল হিসাবের মতো অপকৌশল ব্যবহার করে ভ্যাট ফাঁকি দিতে দেখা গেছে। তাছাড়াও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা না মেনে ইনভয়েস ডিজিটাল রসিদের পরিবর্তে কাগজের রসিদও প্রদান করতে দেখা গেছে। পণ্য ক্রয়ের পর গ্রাহকের কাছ থেকে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভ্যাট আদায় করে আসছে। এই মাধ্যমে আদায়কৃত পুরো ভ্যাটটাই সরকারের রাজস্ব ফাঁকি বলে মনে করছেন কর বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, “ডাবল হিসাব রাখা, ক্যাশ সেল গোপন করা—এসব কৌশল ব্যবহার করে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যা তদন্তের মাধ্যমে সহজেই উদ্ঘাটন সম্ভব।”

আংশিক হিসাব দেখিয়ে সরকারের রাজস্ব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার একটি গোপন হিসাব বাংলাধারার হাতে সংরক্ষিত আছে, যা পরবর্তী সংবাদে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হবে।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি শুধু ভ্যাট ফাঁকি নয়, খাদ্য নিরাপত্তা আইনকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিম্নমানের পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উৎপাদন স্থানে নেই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মানারও কোনো কঠোরতা নেই। ফলে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

গত ১১ এপ্রিল কালুরঘাট বিসিক এলাকায় ওয়েল ফুডস লিমিটেডে মিষ্টি ও দইয়ে তেলাপোকার উপস্থিতি, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং কাঁচামালের রসিদ দেখাতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটিকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এই জরিমানা প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রথম শাস্তি নয়; প্রায় প্রতিবছর এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর জরিমানা দিয়েও ভেজাল খাওয়াচ্ছে ওয়েল ফুড।

তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর নগরীর জিইসি মোড়ে অবস্থিত ওয়েল ফুডে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মোড়কে বিএসটিআই অনুমোদিত চিহ্ন না থাকা এবং ভোক্তাদের প্রতারণা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির আশঙ্কায় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং অনুমোদনহীন পণ্য জব্দ করা হয়।

২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগরীর শাহজাহানপুর থানা এলাকায় বিএসটিআইয়ের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানিকে জরিমানা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি পণ্যের মান সনদ ছাড়া পাউরুটি, চানাচুর, জ্যাম ও আইসক্রিম উৎপাদন, বিক্রয়, বিতরণ ও বাজারজাত করার অপরাধে দোষী প্রমাণিত হয়।

২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর চান্দগাঁও এলাকায় ওয়েল ফুডের কারখানায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে লেবেলবিহীন খাদ্যসামগ্রী, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য এবং অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় খাবার তৈরির অপরাধে তিন লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

এছাড়াও ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বিধিনিষেধ অমান্য করে রাত ৮টার পর দোকান খোলা রাখার অপরাধে ওয়েল ফুডকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

একই কারখানায় ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টান্নজাতীয় খাদ্যদ্রব্য ও বেকারিপণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাত করার অপরাধে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় নিবন্ধন সনদ ছাড়া খাদ্যপণ্য মোড়কজাতকরণ ও বিক্রি করায় ওয়েল ফুড ব্র্যান্ডকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর ঢাকা লালবাগের ওয়েল ফুডে মেয়াদহীন জন্মদিনের কেক বিক্রির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, যার কোনো মূল্য কিংবা উৎপাদনের তারিখ লেখা ছিল না।

২০১৬ সালের ১৬ জুন ড্রেনের পাশে খাবার তৈরি, সংরক্ষণ এবং দইয়ের মূল্য বেশি রাখার দায়ে জিইসি মোড়ের ওয়েল ফুডকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

চিকিৎসকদের মতে, তাদের উৎপাদিত কেক, মিষ্টি, পেস্ট্রিসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যে রেডম্যান লেমন ইয়েলো কালার পেস্ট (ফুড গ্রেড কালার) ব্যবহার করা হয়, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এসব ক্ষতিকর উপাদানের কারণে নানা রোগ হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, “ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। ভেজাল মিশ্রিত খাবারগুলো আমাদের বিভিন্নভাবে আক্রান্ত করছে। অনিরাপদ খাদ্য শুধু স্বাস্থ্যের ঝুঁকিরই কারণ নয়, বরং দেহে রোগের বাসা বাঁধার অন্যতম কারণ। ডায়রিয়া থেকে শুরু করে ক্যানসারসহ দুই শতাধিক রোগের জন্য দায়ী অনিরাপদ খাদ্য।”

খাদ্যে ভেজাল রোধসহ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে কাজ করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। সংস্থাটি বলছে, এ খাতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে এক বছরে মামলা ও জরিমানা আদায় বেড়েছে।

অপরদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ বলছে, গত কয়েক বছরে পণ্যে নকল ও ভেজালের মাত্রা অনেক বেড়েছে। সংস্থাটি অভিযানে গিয়ে এখন ভেজাল অপতৎপরতায় অসাধু ব্যবসায়ীদের বেশি যুক্ত থাকার প্রমাণ পাচ্ছে।

এ বিষয়ে ওয়েল ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম কমুর মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। একাধিক পরিচালকের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কারো মোবাইল বন্ধ, আবার কেউ ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা দিয়েও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য জরুরি হলেও তার চেয়ে বেশি জরুরি নিরাপদ খাদ্য। টেকসই জীবন ও সুস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প নেই। যারা সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে তাদের আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে যারা অনৈতিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করবে তাদের প্রতি আমরা জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করছি। ভোক্তাদের স্বার্থে কোনো অসাধু ব্যবসায়ীকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

বিএসটিআই চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক বলেন, “লাইসেন্সবিহীন বা নবায়ন না করে কিছু প্রতিষ্ঠান পণ্য তৈরি ও বিক্রির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমরা এখন সেদিকেই জোর দিচ্ছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।”

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলেন, প্রতিদিন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এই অভিযানে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য বিক্রির দায়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। জনস্বার্থে এই অভিযান চলমান থাকবে।

দ্বিতীয় পর্বে পড়ুন: ভ্যাট ফাঁকিতে ‘ওয়েল ফুড’-এর যত কারসাজি!

আরও পড়ুন