৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদে ১০% উৎসে কর, বিপাকে কোটি প্রান্তিক সঞ্চয়কারী

অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেন লাখো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। কারও সাপ্তাহিক সঞ্চয় ১০ টাকা, কারও ২০ টাকা। দীর্ঘদিনের সেই ছোট ছোট সঞ্চয়ই একসময় হয়ে ওঠে পরিবারের বিপদের দিনের ভরসা। এবার সেই সঞ্চয়ের বিপরীতে পাওয়া সুদের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর বসানোর উদ্যোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সঞ্চয় করা সদস্যদের দেওয়া সুদের ওপর এই কর কাটার নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর কার্যালয় থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। শুধু চলতি সময়ের কর নয়, আগের দুই অর্থবছরের হিসাবও চাওয়া হয়েছে।

এতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সাধারণ সঞ্চয়কারীদের বিষয়টি। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় করা মানুষের বড় একটি অংশই দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬৩৩টি সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪ কোটি ৭৩ লাখ সদস্য। তাদের সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ৯৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকা।

এত বিপুল সঞ্চয়ের বিপরীতে দেওয়া সুদের ওপর ১০ শতাংশ কর কাটা হলে এর আর্থিক প্রভাবও হবে বড়।

ক্ষুদ্রঋণ খাতের সংগঠন ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএফ) হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই খাতে সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। গড়ে ৬ শতাংশ সুদ হিসাব করলে এক বছরে সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।

এই সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হলে প্রায় ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা কেটে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থাৎ, ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের দেওয়া সুদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত চলে যেতে পারে সরকারি কোষাগারে।

শুধু নতুন কর নয়, পুরোনো হিসাবও
বিতর্কের বড় কারণ হচ্ছে কর আদায়ের সময়সীমা। সংশ্লিষ্ট চিঠিতে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সদস্যদের দেওয়া সুদের ওপর প্রযোজ্য উৎসে কর জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ এতদিন যে কর কাটা হয়নি, সেই অর্থও এখন হিসাব করে জমা দিতে হবে। এর সঙ্গে বিলম্বের জন্য ২ শতাংশ জরিমানার বিষয়ও রয়েছে।

ফলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একসঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপের প্রভাব সদস্যদের ওপর পড়বে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।

আপত্তি ক্ষুদ্রঋণ খাতের
কর আরোপের এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে সিডিএফ। সংগঠনটির যুক্তি, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের একটি বড় অংশ খুব সামান্য পরিমাণ অর্থ নিয়মিত সঞ্চয় করেন। তাদের সঞ্চয়ের উদ্দেশ্য মূলত ভবিষ্যতের জরুরি প্রয়োজন মেটানো।

সংগঠনটির দাবি, এসব সঞ্চয়কারীর ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো হলে তারা ভবিষ্যতে সঞ্চয়ে আগ্রহ হারাতে পারেন।

সিডিএফের পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদনও জানানো হয়েছে।

এমআরএর অবস্থানও ভিন্ন
ক্ষুদ্রঋণ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমআরএও মনে করছে, ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সুদের ওপর এ ধরনের কর আরোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

অন্যদিকে এনবিআরের অবস্থান হচ্ছে, আয়কর আইনের নির্দিষ্ট ধারায় আমানতের ওপর দেওয়া সুদ বা মুনাফার ক্ষেত্রে উৎসে কর কাটার বিধান রয়েছে। সেই আইনি কাঠামোর ভিত্তিতেই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সুদের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

মূল প্রশ্ন প্রান্তিক মানুষের সঞ্চয় নিয়ে

আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে যখন দুই পক্ষের মধ্যে ভিন্নমত, তখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে সাধারণ সঞ্চয়কারীরা।

একজন সদস্য হয়তো মাসে মাত্র কয়েকশ টাকা সঞ্চয় করেন। বছরের পর বছর সেই অর্থ জমিয়ে যখন কিছুটা লাভ বা সুদ পান, সেখান থেকেও যদি ১০ শতাংশ কেটে নেওয়া হয়, তাহলে তার প্রকৃত আয় কতটা থাকবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।

আর এভাবে কোটি কোটি সদস্যের সুদের ওপর কর কাটা হলে এর সামগ্রিক আর্থিক পরিমাণও কম নয়।

একদিকে সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজন, অন্যদিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের আর্থিক নিরাপত্তা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে করা হবে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

কারণ, যে মানুষটি প্রতিদিনের আয় থেকে অল্প অল্প করে টাকা সরিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করছেন, তার সেই সঞ্চয়ের সুদেও যদি করের বোঝা আসে, তাহলে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

আরও পড়ুন