২৫ অক্টোবর ২০২৬

জাল কাগজ, ভুয়া কর্মকর্তা ও বিকাশ নম্বর— প্রবাসীদের নিঃস্ব করছে

চট্টগ্রামে ‘লোন’ পাইয়ে দেওয়ার ফাঁদ, প্রবাসীদের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের নাম ও লোগো ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি-পেজ খুলে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছ থেকে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র।

অনুসন্ধানে চক্রটির ব্যবহৃত একাধিক ফেসবুক আইডি, ইমো অ্যাকাউন্ট এবং মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরের তথ্য পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারকরা নিজেদের কখনো প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কর্মকর্তা, কখনো ‘হেড অফিস’ প্রতিনিধি, আবার কখনো ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সহজ শর্তে ও দ্রুত ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ধাপে ধাপে বিভিন্ন ফি আদায়ের মাধ্যমে প্রতারণা চালানো হয়।

সম্প্রতি সৌদি আরবপ্রবাসী মোহাম্মদ মামুন এ চক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে ৭৮ হাজার টাকা হারিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

মামুন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের লোগোযুক্ত একটি আইডির মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে ঋণ অনুমোদনের কথা বলে ফরম ফি, প্রসেসিং চার্জ, বিমা ও অন্যান্য খরচের নামে কয়েক দফায় তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “তারা নিজেদের ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়েছিল। প্রথমে বিশ্বাস করেছিলাম। পরে বুঝতে পারি, আমি প্রতারকদের ফাঁদে পড়েছি। এখনো ঋণ পাইনি, উল্টো আরও ১০ হাজার টাকা দাবি করছে।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি ০১৯৭৭-৫১৮৪২০ ও ০১৮৫৬-৬৩৫৬৪৮ নম্বরের বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে ভুক্তভোগীদের নির্দেশ দেয়। ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে বলে আশ্বাস দিয়ে একের পর এক অর্থ আদায় করা হয়।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে ৩ হাজার ২০০ টাকা ফরম ফি নেওয়া হয়। এরপর ৩ লাখ ২১ হাজার টাকা ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিমা বাবদ ১৬ হাজার ৫০০ টাকা, প্রবাসী কার্ড বাবদ আরও ১৬ হাজার ৫০০ টাকা এবং বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। পরে ঋণের টাকা ছাড়ের নামে আবারও নতুন করে টাকা দাবি করা হয়।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রতারকরা কম্পিউটার সম্পাদনার মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সিল, ঋণ অনুমোদনপত্র, চেক ও অন্যান্য নথির আদলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভুক্তভোগীদের পাঠায়। এসব নথির কিছু কপি প্রতিবেদকের হাতেও এসেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারকদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবারের সদস্যরা ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করলে কোনো ঋণের তথ্য পাওয়া যায় না। তখন প্রতারকরা ঋণ ‘হোল্ড’ হয়ে আছে বা অতিরিক্ত চার্জ প্রয়োজন বলে নতুন করে অর্থ দাবি করে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানাধীন বায়েজিদ বোস্তামী সড়কে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (চট্টগ্রাম শাখা)-এর সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ও ব্যবস্থাপক সজীব দাশ বলেন, “অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের কেউ আমাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নন। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক কখনো ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে টাকা নিতে বলে না। এটি প্রতারক চক্রের কাজ। প্রবাসীদের সতর্ক থাকতে হবে।”

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের নাম-লোগো ব্যবহার করে প্রতারণা বর্তমানে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া কোনো অফার বা ঋণ সংক্রান্ত প্রস্তাব যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে অর্থ পাঠানোর অনুরোধ এলে তা সন্দেহের চোখে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এর ইন্সপেক্টর কাওছার হোসেন জানিয়েছেন, অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রতারকরা সাধারণত ভুয়া পরিচয়, জাল কাগজপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে থাকে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে অর্থ দাবি করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল নম্বরে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত থানায় অথবা সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিটে অভিযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে প্রবাসীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা এ চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেক প্রবাসী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

আরও পড়ুন