সন্ধ্যা নামতেই একের পর এক ফানুস উড়ল আকাশে। নানা আকৃতির ফানুসের আলোয় রঙিন হয়ে উঠল চট্টগ্রামের রাতের আকাশ। ঢাকঢোলের বাজনা, নাচ-গান আর উৎসবের আনন্দে মুখর নন্দনকানন বৌদ্ধবিহার প্রাঙ্গণ। প্রবারণা পূর্ণিমার এই আয়োজন শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উৎসবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে দিয়েছে সম্প্রীতি ও বিশ্বশান্তির বার্তাও।
ধর্মীয় আচার, সমবেত প্রার্থনা ও বর্ণিল ফানুস উৎসবের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে উদ্যাপিত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। রোববার (২৫ অক্টোবর) নগরীর নন্দনকানন বৌদ্ধবিহারে দিনব্যাপী নানা আয়োজনের পর সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় ফানুস উৎসব। এ সময় অশান্ত বিশ্বে শান্তি ও সুখ কামনায় প্রার্থনা করেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা।
সকাল থেকেই নন্দনকানন বৌদ্ধবিহারে শুরু হয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। ভোরে তথাগত গৌতম বুদ্ধের উদ্দেশে ফুল ও পূজা নিবেদন এবং সমবেত প্রার্থনা করা হয়। পরে পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, ভিক্ষুসংঘের সূত্রপাঠ এবং সকল প্রাণী ও পরলোকগত জ্ঞাতিদের মঙ্গল কামনায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। বিশ্বশান্তি কামনায় জল উৎসর্গের মধ্য দিয়েও দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরা হয়।
বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় ভিক্ষুসংঘের ধর্মদেশনা, সূত্রপাঠ, শীল গ্রহণ, প্রদীপ প্রজ্বালন ও আকাশ প্রদীপ হিসেবে ফানুস উত্তোলনের আয়োজন। সন্ধ্যায় সম্মিলিত প্রবারণা উদ্যাপন পরিষদের উদ্যোগে বৌদ্ধবিহার প্রাঙ্গণে শুরু হয় বর্ণিল ফানুস উৎসব।
বিভিন্ন আকৃতি ও রঙের ফানুস নিয়ে বিকেল থেকেই সেখানে জড়ো হন কিশোর-তরুণেরা। সন্ধ্যায় ‘শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা’ লেখা ফানুস উড়িয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ঢাকঢোলের তালে নেচে-গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন অংশগ্রহণকারীরা। ফানুস উৎসব দেখতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষও সেখানে উপস্থিত হন।
অনুষ্ঠানে নন্দনকানন বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ জিনবোধি ভিক্ষু বলেন, মানুষের মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা ও মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটাতে প্রবারণা পূর্ণিমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ উৎসবের গুরুত্ব বিবেচনায় দীর্ঘদিন ধরে প্রবারণা পূর্ণিমায় এক দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবি জানানো হচ্ছে। তবে সেই দাবি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
সকালের আয়োজনে বিহারের আবাসিক প্রধান প্রিয় রত্ন মহাথের, প্রজ্ঞাপাল মহাথের, সুমনপ্রিয় মহাথেরসহ ভিক্ষুসংঘের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ফানুস উৎসবের অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম সম্প্রীতি ও সাম্যের নগরী। এ শহরকে সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ করে গড়ে তোলা হবে। কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি নগরকে আরও নান্দনিক ও শান্তিপূর্ণ করে গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
জিনবোধি ভিক্ষু পদ্ম মোড় সৌন্দর্যবর্ধনে উদ্যোগ নেওয়ায় সিটি করপোরেশন প্রশাসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে মোড়টি আরও দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলারও অনুরোধ জানান তিনি। প্রবারণা পূর্ণিমার শুভেচ্ছা জানিয়ে অশান্ত বিশ্বে শান্তি ও সুখ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রার্থনা করেন।
সম্মিলিত প্রবারণা উদ্যাপন পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক রুবেল বড়ুয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসের বর্ষাব্রত শেষে প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্যাপন করা হয়। আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত ভিক্ষুরা বর্ষাব্রত পালন করেন। প্রবারণা পূর্ণিমার মধ্য দিয়ে সেই বর্ষাব্রতের সমাপ্তি ঘটে। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি দিনটি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার বার্তাও বহন করে।














