ডেঙ্গুর মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই দেশে ফের ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে এডিস মশাবাহিত এই রোগ। প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন গড়ে চারজন। রাজধানী ছাড়িয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে দেশের বিভিন্ন জেলাতেও। এমন পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন। ফলে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭৫ জনে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪২ হাজার ১২৭ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩ হাজার ২১৮ জন। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের।
নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৯৬ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩৪ জন রয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ৪০৮ জন, ময়মনসিংহে ৭৭, চট্টগ্রামে ১১৭, খুলনায় ২৪২, রাজশাহীতে ১১৬, রংপুরে ৭১, বরিশালে ১৪২ এবং সিলেটে ৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
মাসের সঙ্গে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা
ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে গত তিন মাসের পরিসংখ্যানেও। চলতি বছরের জুনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ এবং আগস্টে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে হয় ২০ হাজার ৫৩৬ জন। সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেও রোগীর সংখ্যা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এক লাখের বেশি মানুষ। মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়ানোর পাশাপাশি মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। আর ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ। ওই বছর মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের।
হাসপাতালেও বাড়ছে জ্বরের রোগী
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগেও বাড়ছে জ্বরের রোগীর চাপ। রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন জ্বর, শরীরে র্যাশ ও ডায়রিয়ার উপসর্গ নিয়ে শিশু রোগী আসছে। এক মাস আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ রোগী বহির্বিভাগে আসতেন, এখন সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
অনেক শিশুর ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও তাদের মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গ থাকায় চিকিৎসকদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত ৫ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
মশা মারার চেয়ে প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একদিকে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যদিকে আক্রান্ত রোগীর মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো— দুই দিকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তার মতে, শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন করলে সাময়িকভাবে মশার ঘনত্ব কমে, কিন্তু প্রজননস্থল রয়ে গেলে সেখান থেকে আবার নতুন মশা জন্ম নেবে।
আগামী দুই মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ঐতিহাসিকভাবেই ডেঙ্গুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে উল্লেখ করেন এই কীটতত্ত্ববিদ।
তিনি বলেন, খণ্ড খণ্ডভাবে অভিযান পরিচালনা না করে মশার প্রজননস্থল, মশার ঘনত্ব ও রোগীর তথ্যের ভিত্তিতে তথ্যনির্ভর জাতীয় কর্মসূচি নিতে হবে। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত দেশজুড়ে একযোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাতে হবে। এডিস মশার আবাস ও ডিম পাড়ার স্থান পরিষ্কার করার পাশাপাশি কার্যকর প্রাপ্তবয়স্ক ও লার্ভা নিধনকারী ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এলাকাভেদে বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর ওষুধ নির্বাচন, মশা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবক, রাজনৈতিক কর্মী ও এনজিও কর্মীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। পাশাপাশি সারা বছর মশা নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম চালু রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার তিন মাসের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আগামী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী তিন মাস ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এ সময়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীদেরও কর্মসূচিতে যুক্ত করা হবে।
মহানগর এলাকায় সিটি করপোরেশন, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা কর্মসূচির সমন্বয় করবেন। এতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবক, স্কাউট, বিএনসিসি, গার্ল গাইড, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেবেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল তিন মাসের কর্মসূচি নয়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বছরজুড়েই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নজরদারি ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।














