বাংলাধারা প্রতিবেদক »
দক্ষিণ পতেঙ্গার দক্ষিণপাড়ার নাগর আলীর নতুন বাড়ির মো. নুরুল আবছার। সবাই যাকে ‘বাবা আবছার’ পরিচয়েই এক নামে চেনে। পতেঙ্গার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের একজন সে। তার নামে রয়েছে একাধিক মাদক মামলা। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে স্পীডবোটযোগে পতেঙ্গায় আসা মাদকের চালানসহ র্যাবের হাতে দু’জন গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে আবারও উঠে এসেছে পুলিশের তালিকাভুক্ত এই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর নাম। তবে এই কারবারে যুক্ত রয়েছেন আরও একজন। যার নাম সাইদুল রহমান সাকিব (৩০)।
গত সোমবার (৩০ জানুয়ারি) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চরপাড়া ঘাট এলাকায় ১৯৭১ হ্যানিকেন বিয়ার প্রাইভেটকারে বহন করার সময়ে দুইজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এসময় সুযোগ বুঝে সটকে পড়েন নুরুল আবছার ও কথিত সাংবাদিক সাকিব। তবে জব্দ করা হয় মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি।
গ্রেপ্তার দু’জন হলেন— নোয়াখালী জেলার হাতিয়া থানার পূর্ব লক্ষীদিয়া গ্রামের মো. রুহুল আমিন (৩১) এবং পতেঙ্গা থানার বিজয়নগর এলাকার মো. নিজাম উদ্দিন (২৬)। অন্যদিকে পলাতক দুই আসামি হলেন— দক্ষিণ পতেঙ্গা দক্ষিণপাড়ার নাগর আলীর নতুন বাড়ির মো. নুরুল আবছার (প্রাইভেটকারের মালিক) ও উত্তর পতেঙ্গা ফয়েজ আহম্মদের বাড়ির সাইদুর রহমান সাকিব।
গ্রেপ্তাররা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, পলাতক দুই আসামি মো. নুরুল আবছার প্রকাশ আবছার ও সাইদুর রহমান সাকিবের সহায়তায় তারা দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে সাগরপথে আমদানি নিষিদ্ধ বিয়ার চোরাচালানের মাধ্যমে অবৈধভাবে সংগ্রহপূর্বক বিক্রয়ের উদ্দেশে বহন করতেন।
এ ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় মোট ৪ জনকে আসামি করে মাদক আইনে মামলা করেছে র্যাব। মামলায় মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে অবৈধভাবে সংগ্রহপূর্বক বিক্রয়ের উদ্দেশে পরিবহন ও নিজেদের হেফাজতে রেখে ১৯৪৭ সনের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-বি ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অভিযোগ আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ৩০ জানুয়ারি ভোর রাতে পতেঙ্গা থানার আউটার রিং রোডে চরপাড়াঘাট এলাকায় বিক্রয় করার উদ্দেশে স্পীডবোটযোগে সাগরপথে আসে মাদকের এই চালান। র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে মাদককারবারিরা পালানোর চেষ্টা করলে স্পীডবোট মালিক মো. রুহুল আমিন (৩১) ও প্রাইভেটকার চালক মো. নিজাম উদ্দিনকে (২৬) আটক করে র্যাব।
এসময় তাদের সঙ্গে থাকা আরও দুইজন লোক পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে আটক দুই আসামিকে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদে পলাতক দুই আসামির নাম ও ঠিকানা জানতে পারে র্যাব। এসময় মোট ১৭৯১টি পিস হ্যানিকেন বিয়ার জব্দ করা হয়। যার বাজারমূল্যে ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৫০০ টাকা। এসময় একটি অ্যাশ রঙের প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়। যার নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-১৪১৮৭৯ জব্দ করা হয়।
নুরুল আবছারের উত্থান
অনুসন্ধানে জানা যায়, পতেঙ্গা দক্ষিণ পাড়ার নুরুল আবছার ২০০০ সালের দিকে ছিলেন নৌকার মাঝি। নৌকা চালিয়েই করতেন জীবিকা নির্বাহ। কিন্তু তার ভাগ্য বদলে যায় নদীর ওপাড়ের ইয়াবা ব্যবসায়ী জাফরের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর। নৌকা দিয়ে জাফরের ইয়াবা পরিবহন করতেন নুরুল আবছার। এক সময় জাহাজ থেকে বিদেশি মদ সংগ্রহ করে বিক্রিও শুরু করেন। আনোয়ারা, কর্ণফুলী এলাকা দিয়ে আবছার তার মাদক বেচাকেনা করতেন।
২০১৫ সালে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার পর ইয়াবা ব্যবসায়ী জাফরের বিপুল ইয়াবা সাম্রাজ্য ধরে রেখেছিলেন নুরুল আবছার। তখন থেকেই ফুলে-ফেঁপে উঠেন। তার নাম রটে যায় ‘বাবা আবছার’ হিসেবেই।
টাকার বিনিময়ে পদ বাগিয়েও হন বহিষ্কার
মাদক ব্যবসা করেই রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে ওঠা এই নুরুল আবছার পতেঙ্গা এলাকায় মাদকের গডফাদার হলেও বরাবরই ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। নিজেকে ‘শেল্টার’ দিতে তিনি টাকার বিনিময়ে বাগিয়ে আওয়ামী লীগের পদও। রাতারাতি হয়ে যান আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য।
মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি নুরুল আবছারকে আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়।
বিদেশি মদসহ ধরা
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৩ জুন নগরের পতেঙ্গা নেভাল রোডের চাইনিজ ঘাটের সামনে থেকে একটি বস্তায় থাকা ৪০ বোতল বিদেশি মদসহ গ্রেপ্তার করে পতেঙ্গা থানা পুলিশ। পরে এ ঘটনায় পুলিশ নুরুল আবছারের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা করলে পরবর্তীতে ওই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
পরবর্তীতে, ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রয়ারি বিদেশি মদের বোতল নিজ হেফাজতে রাখার দায়ে পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী নুরুল আবছারকে ৪ বছর কারাদণ্ড দেন চট্টগ্রামের একটি আদালত। একই রায়ে আদালত তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
পুলিশকে মামলা দিয়ে হয়রানি
২০১৮ সালে পতেঙ্গা থানা পুলিশ ৪০ বোতল বিদেশি মদসহ নুরুল আবছারকে হাতেনাতে ধরলেও পরে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে পুলিশ সদস্যদের হয়রানি করতে ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ ‘ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি ও ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ’ এনে পতেঙ্গা থানার সাবেক ওসিসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন মো. নুরুল আবছার। আদালতের নির্দেশে সেই মামলা তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন।
দুদকের তদন্তে নুরুল আবছারের মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। দুদকের প্রতিবেদনে নুরুল আবছারের মাদক কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরে মিথ্যা অভিযোগ করায় নুরুল আবছারের বিরুদ্ধে দুদক বাদি হয়ে মামলা দায়ের করে।
দুদকের ওই মামলায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি নুরুল আবছারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন সিনিয়র মহানগর স্পেশাল দায়রা জজ আশফাকুর রহমানের আদালত।
এদিকে, মামলার এজাহারের উল্লেখ থাকা পলাতক চার নম্বর আসামি সাইদুর রহমান সাকিব। যিনি ‘সাংবাদিক পরিচয়ে’ দাপিয়ে বেড়াতেন পতেঙ্গার অলিগলি। আর এই প্রভাব খাটিয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বাগিয়ে নেন একটি অস্থায়ী দোকানও। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলেও সরাসরি অভিযোগ করার সাহস পায়নি ভুক্তভোগীরা।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পতেঙ্গা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘মাদকসহ দুইজন আসামিসহ মামলা দায়েরপূর্বক থানায় হস্তান্তর করেছে র্যাব। এই মামলায় মোট চারজন নাম উল্লেখ রয়েছে। বাকি দুইজন আসামিকে গ্রেপ্তার চলছে। তদন্তে আরও কেউ জড়িত প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’












