১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আজ মন্ত্রণালয়ে শুনানি

বিএসসিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও জাহাজ মেরামতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে নতুন মোড়!

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)-তে নিয়োগ, পদোন্নতি, জাহাজ মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে আজ (২৯ জুলাই) গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত এ শুনানিতে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ, মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউর রহমান চৌংসহ চারজনকে লিখিত বক্তব্য ও স্বপক্ষের প্রমাণাদিসহ উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার প্রায় ১০ মাস পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ শুনানিকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (দূরপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়া) মো. আতাউর রহমানের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর যুগ্মসচিব (জাহাজ) মোহাম্মদ এমরান হোসেনকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে গত ১৫ জুলাই জারি করা নোটিশে ২৯ জুলাই সকাল ১১টায় শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএসসির একজন স্থায়ী প্রধান প্রকৌশলীকে (চিফ ইঞ্জিনিয়ার) প্রায় এক বছর ‘অন-স্টাফ’ হিসেবে অফিসে রাখা হয়, যদিও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কোনো জাহাজী কর্মকর্তাকে তিন মাসের বেশি এভাবে রাখার সুযোগ নেই। অভিযোগকারীর দাবি, এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

একই সময়ে ঘুষের বিনিময়ে ছয়জনকে চুক্তিভিত্তিক চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজনের মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার এবং অপর চারজনের মাসিক বেতন ১২ হাজার মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়। এসব নিয়োগে বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী দাবি করেন, অযোগ্য ও ঘুষের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের কারণে বিএসসির জাহাজ বিদেশি বন্দরে জরিমানা ও ডিমেরিট পয়েন্টের মুখে পড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজগুলো উচ্চমূল্যে চার্টার দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এছাড়া কয়েক মাস আগে দুর্ঘটনাকবলিত একটি জাহাজ উদ্ধারে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব ঘটনার সঙ্গে অনিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার যোগসূত্র রয়েছে।

মেরিন ওয়ার্কশপের অপারেটিভ কর্মচারীদের পদোন্নতি নিয়েও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পদোন্নতি কমিটির সভার আগে বিধিবহির্ভূতভাবে একটি বাছাই উপকমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ। অভিযোগ রয়েছে, অধিক যোগ্য গ্র্যাজুয়েট ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বাদ দিয়ে অষ্টম শ্রেণি ও মাধ্যমিক পাস কয়েকজন কর্মচারীকে পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়, যা চাকরি প্রবিধানমালা ও পদোন্নতি নীতিমালার পরিপন্থী।

পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় এক কর্মচারীর কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার কথিত স্বীকারোক্তির বিষয়ও অভিযোগে উঠে এসেছে। দাবি করা হয়েছে, ওই বক্তব্য মোবাইল ফোনে ধারণ করা হলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

জাহাজ মেরামত বিভাগে পছন্দের ঠিকাদারের মাধ্যমে অতিমূল্যে যন্ত্রাংশ ক্রয় ও মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের একটি অডিট আপত্তির উদ্ধৃতি দিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, মেরামতের অযোগ্য দুটি জাহাজ—‘এমটি বাংলার জ্যোতি’ ও ‘এমটি বাংলার সৌরভ’—মেরামতের নামে ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৭৬ হাজার ৯২৭ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ ও তৎকালীন জাহাজ মেরামত বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রশাসনিক বাজেট থেকে অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এ অভিযোগও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

বিএসসির প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্বাহী পরিচালক (প্রযুক্তি) পদ প্রায় আট বছর এবং নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) পদ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে শূন্য রয়েছে। এতে চলতি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নোটিশ অনুযায়ী, আজকের শুনানিতে নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ, অভিযোগকারী মহাব্যবস্থাপক মো. আতাউর রহমান, মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউর রহমান চৌং, রেকর্ড কিপার ও সিবিএ নেতা মো. আতিকউর রহমান এবং মেরিন ওয়ার্কশপের ফোরম্যান ও সিবিএ নেতা মো. নাজমুল আহসানকে উপস্থিত থেকে লিখিত বক্তব্য ও স্বপক্ষের প্রমাণাদি উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন