২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মিরসরাইয়ে বাড়ছে ‘কিশোর গ্যাং’র উৎপাত, জড়াচ্ছে নানা অপকর্মে

শাহ আব্দুল্লাহ আল রাহাত, মিরসরাই »

রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই ১৮ বছর বয়সটিকে ঝড়-ঝঞ্ঝার বয়স হিসেবে উল্লেখ করে সর্তক করেছিলেন ঠিকই, তবে আমাদের আর সর্তক হওয়া হয়ে ওঠেনি। প্রত্যেক শিশুর বিদ্যালয় জীবনে নবম-দশম শ্রেণীর সময়টা বাড়তে থাকে কৌতূহল, আগ্রহ, উদ্দীপনা। তবে অনেক সময় বিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়ার পর কিশোর বয়সে পদার্পণের সাথে সাথে সেই কৌতূহল আর উদ্দীপনা গিয়ে ঠেকে বখাটেপনায়। তারপর মাদক গ্রহণ, চুরি, ছিনতাইয়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে কিশোর গ্যাং।

মিরসরাই গত ২ বছরে বেড়েছে কিশোর গ্যাং এর উৎপাত। বিচ্ছিন্ন কিংবা অনৈতিক সব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বেশির ভাগই ওঠতি বয়সের কিশোররাই।

বিদ্যালয় জীবন শেষ হতে না হতেই ধুমপান আসক্তি থেকে আরো তীব্র নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ছে এসব কিশোর। ধীরে ধীরে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলে পুরোপুরি আসক্ত হয়ে যায় তারা। নেশার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই এবং অনেক সময় মারপিটের ঘটনা ও ঘটায় এসব কিশোর গ্যাং।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টিকটক কিংবা লাইকির মডেলদের মতো এসব কিশোদের মাথার চুলের অগ্রভাগে সোনালী কিংবা হরেক রকম কালারের রং মিশাতে দেখা যায়। নানা অশালীন হেয়ার কাট ভর করে তাদের চুলে।

মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন বাজারগুলোতে এসব কিশোর গ্যাং-এর নিয়মিত আড্ডা প্রত্যেক্ষভাবে স্পষ্ট করা যায়। উপজেলার বারইয়ারহাট, জোরারগঞ্জ, আবু তোরাব, নিজামপুর, করেরহাট, আবুরহাট, ঝুলনপোল, বাংলা বাজারসহ বিভিন্ন বাজারগুলোর কোনো না কোনো স্থানে নেশাগ্রস্ত হয়ে খোশ গল্পে ব্যস্ত থাকে তারা। সন্ধ্যা হতে না হতেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে গ্যাং-এর সদস্যরা।

ইভটিজিং মারামারি কিংবা বাগবিতণ্ডা তাদের নিত্য সঙ্গী। সাথে আছে পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডা। কার্ড, কেরাম, লুডু খেলায় চলে জুয়া। আর এসব জুয়া থেকে শুরু হয় বাগবিতণ্ডা, লিপ্ত হয় মারামারিতে।

সম্প্রতি সময় জোরারগঞ্জে রাতের আঁধারে গরু চুরি, স্কুল ছাত্রকে পিটানো, কার চালককে মারধর, আবু তোরাবে স্কুল ভাঙচূর, দূর্গাপুরে হত্যাচেষ্টা, বারইয়ারহাটে গাড়ি ডাকাতিসহ আরো নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এসব কিশোর গ্যাং-এর সদস্যরা।

কিশোর গ্যাং বেপরোয়া হওয়ার পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরিবারের অভিভাবকরাই দায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় সমাজিক নেতৃবৃন্দ। তারা বলছেন, অনেক পরিবারের ছেলে মেয়েদের সাথে মা-বাবারা খোলামেলা হয়ে কথা বলতে পারেন না এতে দূরত্ব থেকে যায়। মা-বাবারা যেমন তাদের সন্তানদের ঠিকমতো বুঝতে পারেন না ঠিক তেমনি ছেলে-মেয়েরা হয়ে ওঠে অবাধ্য। পারিবারিক শিক্ষার যথেষ্ট অভাব আমাদের সন্তান দের অমানবিক এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের দিকে ধাবিত করছে বলে জানান তারা।

এছাড়া অনেকে সময় অনেক অভিভাবকই জানেন না তাদের সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, কার সাথে মিশছে। প্রয়োজনমত শাসনের অভাব এবং মাঝে মাঝে অতি শাসন কিশোরদের মানসিকতাকে করে তুলছে হিংস্র।

যে বয়সে কিশোদের খেলায় মাঠে দূরন্তপনায় মেতে ওঠার কথা সে বয়সে তারা মেতে ওঠছে নেশায় কিংবা সন্ত্রাস, রাহাজানিতে।পারিবারিক অনুশাসন এবং ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি কিশোদের উপযুক্ত খেলা-ধূলার পরিবেশ তৈরি করার কথা জানান বিশিষ্টজনেরা।

মিরসরাইয়ে জোরারগঞ্জ মারকজুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ মাওলানা আরিফুল ইসলাম বলেন, আমাদের ওঠতি বয়সের ছেলেমেয়ের নৈতিক এবং ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। মহাগ্রন্থ আল কোরআন বুঝার ব্যবস্থা করতে হবে। পরকালীন জীবন সম্পর্কে জানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে কিশোরদের বেপরোয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সামাজিকীকরণ এবং আধুনিকীকরণ বিষয়ে আমাদের ভ্রান্ত ধারণাগুলো উপস্থাপন করায় এসব কিশোর গ্যাং সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান অনেকেই।

মিরসরাই উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ করিম রানা বলেন, অনেকে স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে নিজের বাহিনী ভারি করার জন্য এসব কিশোরদের দিয়ে সংগঠিত করাচ্ছেন নানা ধরণের অপরাধ কর্মকাণ্ড। এটা শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কিংবা এর ভাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগে কোনো প্রকারের অছাত্র, মাদকাসক্ত, অপরাধ জগতের সাথে সম্পৃক্ত তাদের কোনো ঠাঁই নেই। কিশোর গ্যাং-এর সাথে সম্পৃক্ত কিশোরদের কোনো দল নেই। কিছু ক্ষমতা লোভী এবং স্বার্থকেন্দ্রিক মানুষ এসব কিশোরদের ভোগ্য পণ্যের মতো ব্যবহার করে ফেলে দেয়।

কিশোর গ্যাং-এর ভয়ংকর উৎপাত রোধে সর্বপ্রথম সর্তক এবং সচেতন হতে হবে কিশোরদের অভিভাবকদের।তাহলে উৎপাত বন্ধ হবে এসব কিশোর গ্যাংয়ের এবং আলোকিত হবে আগামী প্রজন্ম।

বাংলাধারা/এফএস/এএ

আরও পড়ুন