চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ও তাদের স্বজনদের সাক্ষাৎ এখন আরও স্বস্তিদায়ক। গ্রিলের দুই পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কথা বলার দিন শেষ। বন্দী ও পরিবারের সদস্যদের নির্বিঘ্ন ও স্বচ্ছভাবে কথা বলার সুযোগ দিতে ‘ওয়ান-টু-ওয়ান ইন্টারকম টেলিফোন’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে কারাগারে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) আনুষ্ঠানিকভাবে এ সেবার উদ্বোধন করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় বন্দী ও স্বজনরা গ্রিলের দুই পাশে নির্ধারিত বুথে দাঁড়িয়ে ইন্টারকমের মাধ্যমে সরাসরি কথা বলতে পারছেন। এতে আগের মতো ভিড় ও শব্দের মধ্যে চিৎকার করে কথা বলতে হচ্ছে না।
এর আগে সাক্ষাতের সময় গ্রিলের দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনদের চিৎকার করে কথা বলতে হতো। আশপাশের শব্দ ও ভিড়ের কারণে অনেক সময়ই কারও কথা স্পষ্ট বোঝা যেত না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কথাই অপূর্ণ থেকে যেত। নতুন ব্যবস্থায় সেই দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে বলে জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।
হত্যা মামলায় প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে থাকা খুলশির আমবাগান এলাকার দেলোয়ার হোসেন বাবুলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী রুমা আক্তার ও পরিবারের সদস্যরা। সাক্ষাৎ শেষে বাবুলের বন্ধু মো. সাইফুল হোসেন বলেন, আগে কী বলছি বা ভেতর থেকে কী বলছে কিছুই ঠিকমতো বোঝা যেত না। আজ ইন্টারকমে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলা গেছে।
চোখ ভেজা কণ্ঠে রুমা আক্তার বলেন, তাঁর ছেলে আজ বাবার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পেরেছে—এটাই তাদের জন্য অনেক বড় স্বস্তি। রাজনৈতিক মামলায় বন্দী হালিশহরের মো. শাহাদাৎ হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে এসে তাঁর ভাই মো. আব্বাস উদ্দিন বলেন, এতদিন গলা ফাটিয়ে কথা বলতে হতো। আজ শান্তিতে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ৬ হাজার ৪৫৫ জন বন্দী রয়েছেন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক স্বজন সাক্ষাতে আসেন। ভিড় ও শব্দের কারণে এতদিন অনেকেই ঠিকভাবে কথা বলতে পারতেন না।
তিনি বলেন, “আমি নিজেও কথা বলে দেখেছি—একটি ছোট শিশু তার বাবার সঙ্গে কথা বলছে। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার আদালত করবে। কিন্তু বন্দিদের পরিবারের সদস্যরা তো অপরাধী নন। কারাগারে অবস্থানকালে আমরা যতটুকু সম্ভব মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই।”
কারা অধিদপ্তরের অনুমোদনে আলহাজ শামসুল হক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে কারাগারের নিচতলায় দুই পাশে ১৬টি করে মোট ৩২টি ইন্টারকম বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি পুরুষ ও চারটি মহিলা বন্দীদের জন্য নির্ধারিত। পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় তলাতেও এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, এখন আর চিৎকার করে কথা বলতে হবে না। সারাদেশের কারাগারের মধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারেই প্রথম এত বড় পরিসরে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলো।
ভবিষ্যতে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে একসময় হয়তো অনলাইনে সাক্ষাৎ বা ভিডিও কলের মাধ্যমেও বন্দী ও স্বজনদের কথা বলার সুযোগ তৈরি করা যাবে।
কারাগার শুধু শাস্তির জায়গা নয়, মানবিক ব্যবস্থাপনারও একটি ক্ষেত্র। নতুন এই ইন্টারকম ব্যবস্থায় বন্দী ও স্বজনদের দূরত্ব কিছুটা হলেও কমেছে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।












