চট্টগ্রাম নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিউরো সার্জন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে ১৪ লাখ টাকা প্রতারণা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্রেন টিউমারের ভুল অপারেশনের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা হয়েছে।
ভিকটিম রোগী মাহাবুবুর রহমান বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। পুনরায় টিউমার অপারেশন প্রয়োজন হলেও টাকা না থাকায় করাতে পারছেন না। মামলার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
বাদী আরিফুল ইসলাম গত ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ মামলা দায়ের করেন। আরিফুল ইসলাম ভিকটিম রোগীর চাচাতো ভাই। বাদীপক্ষের আইনজীবী বিশ্ব মিত্র বড়ুয়া মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা হলেন পুলিশ পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী।
মামলায় ডা. মো. ইসমাইল হোসেনকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২৬৯ (অবহেলা বা অসতর্কতা), ২৭০ (ইচ্ছাকৃত বা জেনেশুনে কাজ করা), ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা), ৫০৬(২) (শাস্তিযোগ্য ভয়ভীতি) এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৫৩ ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভিকটিম মাহাবুবুর রহমান চকরিয়ার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের সিকলঘাট এলাকার কৃষক। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় বাদী আরিফুল ইসলাম তাকে গত ১৯ জুলাই, ২০২৫ পার্কভিউ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকরা ডা. ইসমাইল হোসেনের কাছে যেতে বলেন। ডা. ইসমাইল এমআরআই ও সিটি স্ক্যান করার পর ব্রেন টিউমার শনাক্ত করে রোগী ও স্বজনদের ভয় দেখান যে এক সপ্তাহের মধ্যে অপারেশন না করলে মৃত্যু হবে।
তিনি চিকিৎসা ব্যয় বলেন ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। ভয়ে রোগীর পরিবার জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে ৮ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। গত ২৬ জুলাই, ২০২৫ ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিকে অভিযুক্ত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অপারেশন হয়। সেখানে ল্যাবএইড হাসপাতালের বিল বাবদ ৮৩ হাজার ৭০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। এর বাইরে চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন অপারেশন ফি বাবদ আরও ২ লাখ টাকা নেন।
অপারেশন শেষে ওই রাতেই রোগীকে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে করে পার্কভিউ হাসপাতালে নিতে বলা হয়। সেখানে ২৭ জুলাই থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ভর্তি থাকেন মাহাবুবুর রহমান। পার্কভিউ হাসপাতালে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৯১৫ টাকা বিল দিয়ে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
ছাড়পত্রের সময় চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন দাবি করেন, অপারেশন সফল হয়েছে এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে রোগীর শারীরিক অবস্থার দিনদিন অবনতি হয়। পুনরায় চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি তিন মাস পরে আসতে বলেন।
বাধ্য হয়ে ভিকটিমের পরিবার ২১ অক্টোবর, ২০২৫ তাকে চমেকে নিয়ে যান। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বোর্ড মিটিং করে বলেন, ব্রেন টিউমার আগের জায়গায় রয়েছে এবং আগের চেয়ে আরও বড় হয়েছে। তারা দ্রুত অপারেশনের সুপারিশ করেন। এসব রিপোর্ট নিয়ে ডা. ইসমাইল হোসেনের কাছে গেলে তিনি বাদীকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন।
বাদীর দাবি, ভুল অপারেশন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও বিল বাবদ মোট ১৪ লাখ টাকা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “অপারেশনের পর টিউমারটি ভিকটিমের পরিবারকে দেখানো হয়নি। টিউমার দেখতে চাইলে চিকিৎসক জানান, টিউমার ফেলে দেওয়া হয়েছে।”
বর্তমানে রোগীর আবার টিউমার অপারেশনের প্রয়োজন, কিন্তু টাকা না থাকায় তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এ বিষয়ে ভিকটিম রোগী মাহাবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার মন্তব্য জানা যায়নি, কারণ তিনি মৃত্যুশয্যায় কথা বলতে পারেন না।
অপরদিকে, অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. ইসমাইল হোসেন অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। তিনি জানান, বিষয়টি রোগীপক্ষকে একাধিকবার বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তবে তারা তা গ্রহণ করছে না। তার ভাষ্য, কোনো পক্ষ রোগীর স্বজনদের ভুলভাবে প্রভাবিত করছে এবং উসকানি দিচ্ছে।
চিকিৎসক আরও জানান, তারা রোগীপক্ষকে অপারেশনের ভিডিও দেখার অনুরোধ করেছেন। রোগীর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে যতটুকু টিউমার অপসারণ করা নিরাপদ ছিল, ততটুকুই করা হয়েছে। এর বেশি অপসারণ করলে রোগীর জীবনঝুঁকি তৈরি হতো। চিকিৎসকের দাবি, বর্তমানে রোগী জীবিত ও স্থিতিশীল আছেন। অপসারিত অংশ থেকে বায়োপসির জন্য নমুনাও পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, টিউমার একদম অপসারণ না করলে বায়োপসি সম্ভব হতো না।
চিকিৎসক আরও জানান, এ ধরনের অভিযোগ তাদের পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা এবং ভবিষ্যতে জটিল অস্ত্রোপচারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়টি বর্তমানে পিবিআই তদন্তাধীন থাকায় বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন নয় বলে জানান তিনি।
তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত চলছে। চমেকে চিঠি দিয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে অপারেশন ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে মতামত চাওয়া হয়েছে আদালতের আদেশ অনুযায়ী। বোর্ডের মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি ভিকটিম প্রতিকার পেতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, চমেকের নিউরো সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে অপচিকিৎসার মামলায় সাধারণত চরম অবহেলা প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এ মামলায় ৪২০ ধারা (প্রতারণা) যুক্ত হওয়ায় এবং অর্থের পরিমাণ ১৪ লাখ টাকা হওয়ায় চিকিৎসকের জামিন পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে প্রমাণের ভার খুব কঠিন, কারণ মেডিকেল বোর্ডের মতামত এখানে অপরিহার্য। গাফিলতি দুর্ঘটনা নাকি চরম অবহেলা — তা প্রমাণ করা না গেলে শাস্তি পাওয়া দুর্লভ। বর্তমানে ভোক্তা আদালতে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং কম সময়ে নিষ্পত্তি হয়।
এখন চূড়ান্ত ফল নির্ভর করছে পিবিআইয়ের তদন্ত ও মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদনের ওপর। এর আগ পর্যন্ত রোগী মাহাবুবুর রহমান মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আর চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন অপেক্ষা করছেন আদালতের রায়ের দিকে।












