২৫ অক্টোবর ২০২৬

টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, জলাবদ্ধতায় স্থবির জনজীবন

টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের উপজেলাজুড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, বন্ধ রাখতে হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম, স্থগিত করা হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা এবং নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেন চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন।

চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নগরে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা পর্যবেক্ষণাগারের ইতিহাসে ২৪ ঘণ্টায় তৃতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ দুই দিনে মোট ৬৪৯ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

আবহাওয়া অফিসের সহকারী পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা প্রচুর জলীয়বাষ্প এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ ভারী বর্ষণ হচ্ছে। শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রামসহ সমুদ্রবন্দরগুলোকে স্থানীয় সতর্কসংকেত নম্বর-৩ দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

বুধবার সকালেও নগরের কাতালগঞ্জ, চকবাজার, পশ্চিম বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, হালিশহর, কাপাসগোলা, অক্সিজেন-মদুনাঘাট সড়ক, হাটহাজারী সড়কের বড় দীঘির পাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। অনেক এলাকায় রিকশা ও গণপরিবহন চলাচলও ব্যাহত হয়।

সোমবার রাত থেকেই বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য হন।

জলাবদ্ধতার কারণে রেল চলাচলেও প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভীরুল ইসলাম জানান, ষোলশহর থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে রেললাইনের ওপর ১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। নিরাপদ সীমার বেশি পানি থাকায় ইঞ্জিনের ক্ষতির আশঙ্কায় ট্রেন চলাচল আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, আগে থেকেই খাল-নালা পরিষ্কার থাকায় কিছু এলাকায় দ্রুত পানি নেমে গেলেও নগরের বেশিরভাগ এলাকায় বুধবার সকাল পর্যন্ত জলাবদ্ধতা অব্যাহত ছিল।

নগরীর বাইরের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। আনোয়ারায় ঝড়ো বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষতি হওয়ায় অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বুধবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও দিনের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে। এছাড়া নগরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় ছুটি ঘোষণা করেছে।

অবিরাম বৃষ্টিতে নগর ও পার্বত্য এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের মাইকিং করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম নগর, রাঙ্গুনিয়া, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে দেয়াল ধস ও পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা অতিরিক্ত জলীয়বাষ্পের কারণে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

আরও পড়ুন