প্রায় দুই বছর ধরে চেয়ারম্যানশূন্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিএনপির অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও তৎপরতা। জেলা পরিষদ বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে এবার কাকে বসানো হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান পদে অন্তত দশজন বিএনপি নেতা সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, কেউ আবার দলের নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী নেতাদের মাধ্যমে নিজের পক্ষে সমর্থন তৈরির চেষ্টা করছেন।
পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবরণ, রাজনৈতিক নির্যাতন এবং দলের প্রতি দীর্ঘদিনের অবদানের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের বক্তব্য, দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, দলের দুঃসময়ে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যথায় তৃণমূলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও এ পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আগ্রহও স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
গত ১১ জুন উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। এর আগে তাঁকেই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা ছিল। সিডিএতে তাঁর নিয়োগের পর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নতুন মুখ নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে দেশের অন্যান্য জেলা পরিষদের মতো চট্টগ্রাম জেলা পরিষদও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘ সময় চেয়ারম্যান না থাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং জনপ্রতিনিধিত্বের বিষয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
চেয়ারম্যান পদে যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে তারা হলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হক, কেন্দ্রীয় বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ মো. মহিউদ্দিন, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ইফতেখার হোসেন চৌধুরী, উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক মো. জসিম উদ্দীন চৌধুরী, ব্যারিস্টার তারেক আকবর খোন্দকার, লায়ন মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পাসহ আরো অনেকেই।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সক্ষমতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, জনগ্রহণযোগ্যতা এবং দলের প্রতি দীর্ঘদিনের অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, অনেকেই চেয়ারম্যান হতে আগ্রহী এবং বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগও করছেন। তবে শেষ পর্যন্ত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
অন্যদিকে চেয়ারম্যান পদপ্রত্যাশী দক্ষিণ এর এক বিএনপি নেতা বলেন, দলের কঠিন সময়ে যারা রাজপথে ছিলেন এবং জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তাঁদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত। কোনো সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
জেলা পরিষদের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আনাগোনা ও যোগাযোগ বেড়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গন এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। চেয়ারম্যান নিয়োগের মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে বলেও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।














