২৫ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রামে বন্যা-পাহাড়ধসে মৃত্যু ৫৩, তিন লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দি

টানা অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন এবং এখনও প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

এদিকে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি, উদ্ধার তৎপরতা এবং ত্রাণ বিতরণ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আগাম সতর্কতা ও পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতি, উদ্ধারকাজে ধীরগতি এবং দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে ব্যর্থতার কারণে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

রোববার আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ পানিবন্দি থাকলেও প্রশাসনের তৎপরতা দৃশ্যমান ছিল না। একই সঙ্গে তিনি উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগও তোলেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সময়মতো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়নি। বন্যা শুরু হওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্র চালু হলেও সেখানে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব ছিল।

বিশেষ করে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের মতো দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজে পর্যাপ্ত নৌযান ও সরঞ্জামের সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে জেলা প্রশাসনের অনুরোধে সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।

এ ছাড়া প্রধান সড়কসংলগ্ন এলাকায় ত্রাণ পৌঁছালেও অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে মানুষ দীর্ঘ সময় খাবার ছাড়াই অবস্থান করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নদী-খাল নিয়মিত খনন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ের অভাবকেও দুর্যোগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন স্থানীয়রা।

প্রশাসনের ১০ দফা পদক্ষেপ
সমালোচনার মধ্যেই জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা ও পাহাড়ধস মোকাবিলায় ১০ দফা জরুরি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় দুর্গত এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি, আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া, মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে এখনও পানিবন্দি লাখো মানুষ
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলায় এখনও প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। উপজেলার ৯২টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে পাঁচটি চালু রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩০০ মানুষ অবস্থান করছেন।

বাঁশখালী উপজেলায় এখনও প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে চার হাজারের বেশি মাটির ঘর ধসে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে।

চট্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ছয় লাখ মানুষ
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মহানগরসহ ১৬টি উপজেলায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। জেলার ১২২টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলায় এ পর্যন্ত বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৩ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। বর্তমানে ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৬ হাজার ৮২১ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলায় চার লাখের বেশি এবং বাঁশখালীতে এক লাখের বেশি মানুষ দুর্যোগের শিকার হয়েছেন।

ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত
দুর্গতদের জন্য এক হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৮৫ লাখ টাকা, ৪৫ হাজার ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষের জন্য রান্না করা খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৯১৫ মেট্রিক টন চাল ও ৭০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির তালিকা প্রস্তুত করে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন