অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) আলোচিত প্রকৌশলী দম্পতি মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তাকে স্বপদে বহাল রাখতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে মেয়রের পক্ষ থেকে ডিও লেটার পাঠানোর ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মাত্র কয়েক দিন আগে এই দুই কর্মকর্তাকে চট্টগ্রামের বাইরে বদলি করে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। বদলি আদেশ অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তাকে রংপুর সিটি করপোরেশনে পদায়ন করা হয়।
আগামী ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলি আদেশ কার্যকর হওয়ার আগেই তাদের চসিকে রেখে দেওয়ার জন্য মেয়রের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়। এমনকি বদলি আদেশের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করার বিষয়টি নিয়েও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা চলছে।
ডিও লেটারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তা। তবে মেয়রের কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মেয়রের পাঠানো ডিও লেটারে চসিকের চলমান উন্নয়ন প্রকল্প, জলাবদ্ধতা নিরসনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তুতি ও সমীক্ষা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে জনবল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়, চসিকের কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় প্রকৌশলী সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় দুই প্রকৌশলীকে অন্য দুই সিটি করপোরেশনে বদলি করা হলে চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া ডিও লেটারে উল্লেখ করা হয়, শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী ও ফারজানা মুক্তা স্বামী-স্ত্রী এবং চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা। তাদের দুই নাবালক সন্তানের শিক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে বদলি আদেশ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়।
তবে এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন—যে দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি, তদন্তের মধ্যেই তাদের বদলি করা হলো কেন; আর বদলি আদেশ জারির পরপরই তাদের ফেরাতে চসিকের পক্ষ থেকে সুপারিশের প্রয়োজনই বা হলো কেন?
তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই বদলি, এরপর ফেরানোর উদ্যোগ
গত ২৫ জুন চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে মেহেদী চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেয়। অভিযোগগুলো যাচাই করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়।
তদন্ত চলমান থাকার মধ্যেই ২৩ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ পৃথক প্রজ্ঞাপনে দুই কর্মকর্তাকে চট্টগ্রামের বাইরে বদলি করে। ফলে প্রশাসনিকভাবে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল—তারা নতুন কর্মস্থলে যোগ দেবেন এবং চলমান তদন্ত তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে।
কিন্তু বদলি আদেশের পর তাদের চসিকে রেখে দেওয়ার জন্য মেয়রের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠানোর ঘটনায় তদন্তের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা এবং জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
চসিকের জনবল সংকট—যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
দুই প্রকৌশলীকে চসিকে রাখার পক্ষে মেয়রের ডিও লেটারে জনবল সংকট ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হলেও চসিকে প্রকৌশলী সংকটের কারণ দেখিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সে সময় চসিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ওই যুক্তিতেই পরে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন।
কিন্তু দুই বছর পরও যদি একই ধরনের জনবল সংকট দেখিয়ে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি ঠেকাতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—চসিকের প্রকৌশলী জনবল ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়?
একটি সিটি করপোরেশনের হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প যদি নির্দিষ্ট এক বা দুই কর্মকর্তার ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে তাদের বদলি হলেই প্রকল্প বাস্তবায়ন থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে সেটি কেবল জনবল সংকটের বিষয় নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
আগের বদলি, আবার ফিরে আসা—প্রশ্নের এখানেই শেষ নয়
দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রশাসনিক কারণে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়েছিল। পরে চসিকে প্রকৌশলী সংকটের কথা উল্লেখ করে তাকে পুনরায় চট্টগ্রামে ফিরিয়ে আনা হয়।
দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তদন্ত চলমান অবস্থায় তাকে ময়মনসিংহে বদলি করা হয়েছে। এর পরপরই তাকে চসিকে রেখে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বদলি যদি প্রশাসনিক প্রয়োজনেই হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তা প্রত্যাহারের সুপারিশ কেন? আর যদি চসিকে তাদের প্রয়োজনই এত বেশি হয়, তাহলে অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন তাদের বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি কেন?
অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্বচ্ছতা জরুরি
দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো প্রমাণিত নয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকে সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে, অভিযোগকারীর বক্তব্যও তদন্তের বিকল্প নয়।
তবে তদন্ত চলমান অবস্থায় প্রশাসনিকভাবে তাদের বদলি করা, বদলি আদেশের পর তাদের ফেরাতে সুপারিশ পাঠানো এবং নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পরিবর্তে চসিকে থাকার চেষ্টা— এই পুরো প্রক্রিয়া প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে চসিকের মতো একটি বৃহৎ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা অপরিহার্য নন—এটাই হওয়া উচিত প্রশাসনিক নীতি। জনবল সংকট থাকলে নতুন প্রকৌশলী নিয়োগ, পদায়ন বা দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলতে হয়। নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে ধরে রেখে প্রকল্প বাস্তবায়নের যুক্তি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিনির্ভর করে তুলতে পারে।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ, বক্তব্য মেলেনি
এদিকে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, চসিকের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দুই প্রকৌশলীকে চট্টগ্রামে রেখে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আগ্রহী। ওই চক্রই মেয়রকে প্রভাবিত করে ডিও লেটার পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে বলে অভিযোগ সূত্রটির।
তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। প্রকৌশলী ফারজানা মুক্তা অবশ্য দাবি করেছেন, “ডিও লেটারটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয় বিবেচনা করবে। যারা অপপ্রচার চালাচ্ছে, সেই চক্রই আমাদের বদলি করিয়েছে। সত্য একদিন প্রকাশ পাবেই।”
অন্যদিকে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
এখন নজর তদন্ত প্রতিবেদনে
দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। অভিযোগের সত্যতা, তদন্তের পর্যবেক্ষণ এবং এর ভিত্তিতে কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাদের স্বপদে বহাল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হলে তা তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি প্রভাব না ফেললেও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চসিকের উন্নয়ন প্রকল্প অবশ্যই চলমান রাখতে হবে। জনবল সংকটও বাস্তব সমস্যা হলে তার সমাধান করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়নের স্বার্থে কোনো কর্মকর্তাকে প্রয়োজন হতে পারে—কিন্তু সেই প্রয়োজন যেন তদন্ত, বদলি নীতি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ঊর্ধ্বে চলে না যায়, সেটিই এখন চসিক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সামনে বড় প্রশ্ন।














