সন্ধ্যা নামতেই আকাশজুড়ে একের পর এক উড়তে শুরু করল ফানুস। লাল, নীল, হলুদসহ নানা রঙের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল চট্টগ্রামের রাউজানের রাতের আকাশ। কোথাও বৌদ্ধ কীর্তনের সুর, কোথাও সমবেত প্রার্থনা, আবার কোথাও শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রবারণা পূর্ণিমার এই আয়োজনে যোগ দিলেন অন্য ধর্মের মানুষও। লক্ষাধিক ফানুসের আলোয় রাউজানে যেন ছড়িয়ে পড়ল অহিংসা, শান্তি, মৈত্রী ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে উপজেলার ১৩৭টি বৌদ্ধ বিহার এবং এসব বিহারের আওতাধীন পাড়া-মহল্লা ও গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশে ফানুস উত্তোলন করা হয়। দিনভর বুদ্ধপূজা, সমবেত প্রার্থনা, মহাসংঘদান, ধর্মীয় আলোচনা, শিশু-কিশোরদের প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্যাপন করেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা।
সন্ধ্যায় পূর্বগুজরা ইউনিয়নের হোয়ারাপাড়া গ্রামের ঐতিহাসিক রামদাশ মহাবিহার ও ভাবনা কেন্দ্রে দেখা যায় উৎসবের প্রাণবন্ত চিত্র। নতুন পোশাকে কয়েক শ নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও প্রবীণ সেখানে সমবেত হন। বৌদ্ধ কীর্তনের সুরে প্রার্থনার পাশাপাশি দলবদ্ধভাবে একের পর এক ফানুস ওড়ান তাঁরা।
এই দৃশ্য দেখতে বিহার প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের শতাধিক মানুষ। ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ফুটে ওঠে রাউজানের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চিত্র।
নগর থেকে ফানুস দেখতে আসা কবি সরোয়ার রানা বলেন, আনন্দ-উৎসব কোনো ধর্মের মধ্যে আবদ্ধ রাখা যায় না। ফানুস বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসবের অংশ হলেও ছোটবেলা থেকেই তাঁরা এটি উপভোগ করে আসছেন। সন্ধ্যার পর বিহারে বিহারে এবং গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকে ফানুস ওড়ানো হয়। এতে আশপাশের আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে। মনে হয়, রাতের আকাশের তারাগুলো যেন নিচে নেমে এসেছে।
ফানুস উৎসব দেখতে আসা চক্ষু চিকিৎসক নীলাদ্রি দাশগুপ্ত বলেন, প্রতিটি ধর্মের আচার, সংস্কৃতি ও উদ্যাপনের ধরন আলাদা হলেও উৎসবের আনন্দ সবার। ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে সবাই মিলে উৎসব উপভোগ করেন।
প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে চলে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মসূচি। সকালে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, প্রভাতি বন্দনা, শীল গ্রহণ, বুদ্ধপূজা, মহাসংঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান ও ভিক্ষুসংঘের পিণ্ডদান অনুষ্ঠিত হয়।
দুপুরে ত্রিপিটক পাঠ, ধর্মীয় আলোচনা ও প্রবারণা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সময় পারস্পরিক ভুলত্রুটি স্বীকার, ক্ষমা প্রার্থনা এবং দেশ, জাতি ও বিশ্বের সব প্রাণীর সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় প্রার্থনা করা হয়। বিভিন্ন বিহার ও সামাজিক সংগঠন শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন ও ধর্মীয় প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে।
বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, গৌতম বুদ্ধের কেশধাতু স্বর্গে দেবতাদের দ্বারা চূড়ামণি চৈত্যে সংরক্ষণ ও পূজার পুণ্যস্মৃতির সঙ্গে ফানুস উত্তোলনের ঐতিহ্য জড়িত। সেই ঐতিহ্য ধারণ করে সন্ধ্যায় বিহার ও বিভিন্ন বাড়ি থেকে আকাশে ওড়ানো হয় রঙিন ফানুস। পাশাপাশি প্রদীপ প্রজ্বালন, বৌদ্ধ কীর্তন ও ধর্মীয় গাঁথা পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে বিহার প্রাঙ্গণ।
ঐতিহাসিক রামদাশ মহাবিহার ও ভাবনা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ ভদন্ত করুণানন্দ ভিক্ষু বলেন, অহিংসা, শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রাউজানে লক্ষাধিক ফানুস উত্তোলন করা হয়েছে। তাঁর বিহার ও এর আওতাধীন এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশে আড়াই হাজারের বেশি ফানুস ওড়ানো হয়েছে।
নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্যাপনে সহযোগিতার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সবার প্রতি মৈত্রীময় শুভেচ্ছা জানিয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন এই বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা।
পাহাড়তলী ইউনিয়নের মহামুনি সেবক সংঘ ও তরুণ সংঘের সাবেক সভাপতি রনজিৎ চৌধুরী বাবলু বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে মহামুনি গ্রামের তিনটি সামাজিক সংগঠন, সাতটি বিহার ও এসব বিহারের আওতাধীন আট শতাধিক পরিবারের উদ্যোগে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার ফানুস উত্তোলন করা হয়েছে।
এ উপলক্ষে সেবক সংঘের আয়োজনে সাত পাকসহ বৌদ্ধ কীর্তন ও সমবেত বুদ্ধপূজা, তরুণ সংঘের উদ্যোগে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং সংস্কৃতি সংঘের আয়োজনে ধর্মীয় গাঁথা প্রতিযোগিতাসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, রাউজান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রেখে ধর্মীয় উৎসব পালন করেন। কোনো অপশক্তি যাতে এ সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাসভার মহাসচিব ভদন্ত সুমেধানন্দ মহাথেরো বলেন, থেরোবাদী বৌদ্ধধর্মে প্রবারণা আত্মশুদ্ধি, পারস্পরিক সংশোধন, বিনয়ানুশাসন ও সংঘের ঐক্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। সাধারণত তিন মাসব্যাপী বর্ষাবাসের সমাপ্তিতে আশ্বিনী পূর্ণিমায় এ উৎসব পালিত হয়। প্রবারণার মধ্য দিয়ে ভিক্ষুসংঘের সদস্যরা নিজেদের ভুলত্রুটি চিহ্নিত ও সংশোধনের সুযোগ পান। এর ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশসহ থেরোবাদী বৌদ্ধপ্রধান বিভিন্ন দেশে প্রবারণা ধর্মীয় চেতনা, দানশীলতা, নৈতিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিজের ভুল স্বীকার করা, অন্যের গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণ এবং আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার চর্চার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্প্রীতি জোরদার করাই প্রবারণার মূল শিক্ষা।
রাউজানের আকাশে উড়ে যাওয়া লক্ষাধিক ফানুস যেন সেই শিক্ষারই প্রতীক হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে ফানুসের আলোয় উচ্চারিত হয়েছে এমন এক প্রত্যাশা—পার্থক্য থাকবে, থাকবে ভিন্ন বিশ্বাস ও সংস্কৃতি; তবু ভালোবাসা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় একসঙ্গে এগিয়ে যাবে মানুষ।














