চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার মুছাপুরে যুবদল নেতা জাকারিয়া তসলিম ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, মারামারি, জোরপূর্বক ফসল কেটে নেওয়া এবং সরকারি খাসজমি দখলসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ও ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। তবে অভিযোগগুলো অস্বীকার করে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেছেন জাকারিয়া তসলিম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জাকারিয়া তসলিম মুছাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের সদস্যসচিব পদে রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। একসময় তিনি পেশায় মাইক্রোবাসচালক ছিলেন এবং হালিশহর থেকে কুমিরা ঘাটে যাত্রী পরিবহন করতেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে গত ৫ আগস্টের পর এলাকায় তার প্রভাব ও অনুসারীদের তৎপরতা বেড়েছে। তার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ দল বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পৈতৃক সম্পত্তিতে রাতের আঁধারে মাটি ভরাটের অভিযোগ
মুছাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. গিয়াস উদ্দিনের পৈতৃক সম্পত্তিতে রাতের আঁধারে মাটি ভরাট করে চলাচলের রাস্তা তৈরির অভিযোগ উঠেছে জাকারিয়া তসলিমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জাকারিয়া তসলিম, আবুল কালাম, জাহাঙ্গীর ও ইদ্রিসকে বিবাদী করে সন্দ্বীপ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মো. গিয়াস উদ্দিন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গিয়াস উদ্দিনের বসতবাড়ির সামনে প্রায় ২০ কড়া পৈতৃক সম্পত্তি রয়েছে। ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর রাতে বিবাদীরা ওই সম্পত্তিতে মাটি ভরাট করে চলাচলের পথ তৈরি করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাকে খুন-জখমের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে জাকারিয়া তসলিম বলেন, ‘যে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেছে, সেটি মূলত একটি রাস্তা। আমরা রাস্তা সংস্কারের কাজ করছিলাম। যেহেতু এই রাস্তা দিয়ে একটি হাসপাতাল, মসজিদ, স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের যাতায়াত রয়েছে। আজকে সরেজমিনে থানা ও উপজেলা প্রশাসনের লোকজন পরিদর্শন করে গেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সামনে আমার ইউনিয়ন থেকে জনগণের সমর্থন নিয়ে মেম্বার পদপ্রার্থী হব। তাই আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য একটি চক্র উঠে-পড়ে লেগেছে।’
অন্যদিকে মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে আমরা খুবই ভীত অবস্থায় আছি। অভিযুক্তরা আমাদের পৈতৃক পুকুর রাতের আঁধারে মাটি ভরাট করে দখল করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কিছু বললে হামলা, মামলা ও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে থানায় অভিযোগ করেছি এবং আদালতেও একটি মামলা দায়ের করেছি। এসব দখলদারের বিরুদ্ধে আমরা আইনগতভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। তাদের জুলুম থেকে রক্ষা পেতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।’
পুকুরের মাছ চুরির অভিযোগে ভিন্ন বক্তব্য
জাকারিয়া তসলিমের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী সাফিরুল খায়ের স্বপন তালুকদারের পুকুর থেকে রাতের আঁধারে জাল টেনে মাছ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বপন তালুকদার বলেন, পুকুর থেকে মাছ চুরির ঘটনায় জাকারিয়া তসলিম জড়িত নন। তার ধারণা, সাধারণ চোরেরাই পুকুর থেকে মাছ চুরি করেছে। এসব চোরের দল সব সময় মানুষের জিনিসপত্র চুরি করে থাকে। তিনি আরও বলেন, জাকারিয়া তসলিম সন্দ্বীপের লোক হলেও তাদের এলাকার বাসিন্দা নন।
শালিসের নামে হয়রানি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় বিভিন্ন বিরোধের ঘটনায় শালিস-বিচারের নামে প্রভাব বিস্তার এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হয়। তসলিম ও তার অনুসারীদের ভয়ে অনেকেই নিজেদের অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, তসলিমের সঙ্গে শতাধিক লোক রয়েছে। তাদের মধ্যে মাহফুজ, রিদোয়ান, কালাম, জাহাঙ্গীর, কাদের ও নজরুলসহ বেশ কয়েকজন সক্রিয় রয়েছেন। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সংঘবদ্ধভাবে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা আদায় এবং জোরপূর্বক জমি দখলের মতো কর্মকাণ্ডে এই চক্র জড়িত।
গরু-মহিষ চুরির অভিযোগ
জাকারিয়া তসলিমের মামা জহিরের বিরুদ্ধেও গরু-মহিষ চুরি করে জবাই ও মাংস বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, চুরি করা গরু-মহিষ ওসমান গনি তালুকদার বাড়ির উত্তর পাশে একটি বাগানে সামিয়ানা দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়। পরে রাতে সেগুলো জবাই করে সকালে ধোপার হাটে বিক্রি করা হয়।
ছাত্রদল নেতা হৃদয়ের ওপর দুই দফা হামলার অভিযোগ
জাকারিয়া তসলিমের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুর নবী হৃদয়ের ওপর তার অনুসারীরা দুই দফা হামলা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নুর নবী হৃদয় বলেন, ‘জাকারিয়া তসলিম একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। মাদক, চোরাকারবার, মারামারিসহ সবকিছুতেই তিনি জড়িত। তার অপকর্মের প্রতিবাদ করায় আমার ওপর দুই দফা হামলা হয়েছে। আমরা মূলধারার রাজনীতি করি। তারা ৫ আগস্টের পর এসে বিভিন্ন অপকর্ম করে দলের সম্মানহানি করছেন। এসবের বিরুদ্ধে আমরা নিরীহ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সব সময় প্রতিবাদ করে আসছি।’
তিনি আরও জানান, জাকারিয়া তসলিমের বিরুদ্ধে দলের হাইকমান্ডের কাছেও অভিযোগ করেছেন।
ব্যবসায়ী সাহাব উদ্দিনের ওপর হামলা
সর্বশেষ গত ২১ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে সন্দ্বীপ উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কেরানী মার্কেট এলাকায় সাহাব উদ্দিন (৪০) নামের এক ব্যবসায়ীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ হামলায় জাকারিয়া তসলিমের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা সাহাব উদ্দিনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। পরে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যান তারা। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে সেলাই দিতে হয়েছে।
আহত সাহাব উদ্দিনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার হাত, মাথা, বুক ও পায়ের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে।
সাহাব উদ্দিন বলেন, হামলায় তার হাত, মাথা, বুক ও পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাত লেগেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় তার পরিবার মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে জাকারিয়া তসলিমের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্যে রাস্তা সংস্কার নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে তাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি। তবে জমি দখল, চাঁদাবাজি, হামলা ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।













