৮ নভেম্বর ২০২৬

মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রীকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিলেন মেয়র নাছির: নগরজুড়ে তোলপাড়

বাংলাধারা প্রতিবেদন »

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় প্রতিনিধি সভার মঞ্চ থেকে প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনসহ তিনজনকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন তিন নেতাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেন। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মাঝে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে এ ঘটনায় নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তোলপাড়।

রোববার (২৭ অক্টোবর) সকালে নগরীর পাঁচলাইশে একটি কমিউনিটি সেন্টারে আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৬টি জেলার সাংগঠনিক প্রতিনিধি সম্মেলনে এ ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে ঘটনার সময় তিনি অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাননি।

বেলা ১১টা থেকে সোয়া ১১টার মধ্যে তিন নেতাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। মঞ্চ থেকে হাসিনা মহিউদ্দিনকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু। তিনি দ্রুত মেয়র নাছির উদ্দীনের কাছে গিয়ে আপত্তি জানান। মেয়র নাছির উদ্দীন তাঁকে পাল্টা জবাব দিয়ে বলেন, ‘অঙ্গসংগঠনের কারও মঞ্চে ওঠার কথা নয়। তুমি কি উঠেছ?’ এরপর মহিউদ্দিন বাচ্চু মেয়রকে বলেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী আমাদের আবেগের জায়গায় আছেন। তাঁর স্ত্রী নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে নয়, মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী হিসেবে মঞ্চে উঠতে পারেন। আর নিজের ইচ্ছায় তিনি ওঠেননি। মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী (নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি) তাঁকে মঞ্চে উঠিয়েছেন।’

হাসিনা মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বাধ্য হওয়া অপর দুই নেতা হলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম এবং নগর আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক আহমেদুর রহমান সিদ্দিকী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল পৌনে ১১টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা লীগের সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিন। মঞ্চ থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী তাকে হাতের ইশারায় মঞ্চে ডাকেন। তখন নগর আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক চন্দন ধর তাকে মঞ্চে পৌঁছে দেন। হাসিনা মহিউদ্দিন অতিথিরদের দ্বিতীয় সারিতে বসেন। এরপর সভার সঞ্চালক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বারবার নির্দিষ্ট পদধারী নেতাদের বাইরে যারা মঞ্চে আছেন তাদের নেমে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একপর্যায়ে মঞ্চে থাকা আয়োজকদের কয়েকজন তাকে মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বলেন। তখন তিনি মঞ্চ থেকে নেমে যান। মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী নেতাকর্মীরা দর্শকসারির সামনে তার জন্য চেয়ার এনে দিলে সেখানে বসেন।

মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রয়াত নেতা মহিউদ্দিন চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যে ভূমিকা রেখেছিলেন সেটি অনস্বীকার্য। তার স্ত্রীকে এভাবে অসম্মান করাটা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে, মেয়র আ জ ম নাছিরের অনুসারীদের কথা, দলীয় সভায় যাদের মঞ্চে বসার কথা ছিল তারাই যেন বসেন সেটিই নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন মেয়র। বিনীতভাবেই তিনি কাজটি করেছেন।

প্রতিবাদকারী নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন, ‘প্রতিনিধি সভায় হাসিনা মহিউদ্দিন তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে বসেছিলেন। মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর আহ্বানেই তিনি মঞ্চে উঠেছেন। এর ২০ মিনিটের মধ্যে মেয়র নাছির তাঁকে নেমে যেতে বলেন। তখন আমি মেয়রের কাছে আপত্তি জানিয়েছি। এখানে ঝগড়া-সংঘাতের কোনো বিষয় ছিল না।’

মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন, ‘প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রীকে নামিয়ে দেওয়া উচিত হয়নি। যদিও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে হাসিনা মহিউদ্দিনের মঞ্চে ওঠার কথা ছিল না। কিন্তু নগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং একাধিক বিভাগীয় সম্পাদক কী করে মঞ্চে ওঠেন?’

সিদ্ধান্ত অমান্য করে মঞ্চে ওঠা নেতাদের নাম জানতে চাইলে মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন, নগরের সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান মাহমুদ হাসনি মাইক্রোফোনে বিভিন্ন ঘোষণা দেন। তিনি কী করে মঞ্চে ওঠেন?

দলীয় সূত্র জানায়, হাসান মাহমুদ হাসনি নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং দেওয়ানবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি মেয়র নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও মঞ্চে উপস্থিত নগর আওয়ামী লীগের দুই নেতা নাম প্রকাশ না করে সাংবাদিকদের জানান, হাসিনা মহিউদ্দিন এবং আবদুচ ছালামকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়া শোভন হয়নি। তবে দলীয় শৃঙ্খলার চর্চাও সবাইকে করতে হবে। এই দুই নেতা মনে করেন, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থেকে এ কাণ্ড ঘটতে পারে।

জানতে চাইলে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘প্রতিনিধি সভার মঞ্চে কে থাকবেন আর কে থাকতে পারবেন না, তা দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত হয়। মঞ্চ মন্ত্রী, সাংসদ ছাড়াও কেন্দ্রীয় নেতা এবং জেলা কমিটির সভাপতি, সম্পাদক ও নগর কমিটির সহসভাপতিদের জন্য বরাদ্দ ছিল। এর বাইরে যাঁরা ওঠেন, তাঁদের বিনীতভাবে নেমে যেতে বলেছি।

মেয়র নাছিরের ভাষ্য, ‘শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে আমি তাঁদের নেমে যেতে বলেছি। এটা নিয়ে রাজনীতি করা দুঃখজনক।’

উল্লেখ্য, হাসিনা মহিউদ্দিনের স্বামী মহিউদ্দিন চৌধুরী ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর মারা যান। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে টানা ১৭ বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম শহরে যারা আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছেন তাদের মধ্যে মহিউদ্দিন চৌধুরী অন্যতম। এজন্য আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব তাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। তার মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ