৭ মার্চ ২০২৬

চুক্তির ২২ বছরেও ফেরেনি শান্তি, ক্রমে অশান্ত হয়ে উঠছে পাহাড়

জসিম উদ্দিন জয়নাল, খাগড়াছড়ি »

পাহাড়ী জনপদ পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বসহ বিভিন্ন কারণে পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২২বছর পরও পাহাড়ে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ফিরে আসেনি। বরং অব্যাহত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জাতিগত বিদ্বেষের কারণে পার্বত্য জনপদে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন হলেও ভূমি জরিপসহ কয়েকটি ইস্যুতে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্বত্য জেলাগুলোতে বিদ্যমান সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে পাহাড়ের পরিবেশ দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। নিজেদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতি ভেঙে এখন চার টুকরা। এই চার সংগঠনের প্রভাবিত এলাকায় সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত জীবন-যাপন করছে। অনেকে লাশ হয়েছে খাগড়াছড়ি জেলায়।

সম্প্রতি হঠাৎ করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরই হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলায় সেনাসদস্যদের ওপর গুলি বর্ষণ হয়েছেন। বাঘাইহাট থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে ভোট কেন্দ্র থেকে ফেরার পথে নির্বাচন কর্মকর্তাসহ আনসার সদস্য খুন সব মিলে শান্তিচুক্তির ২২বছরে ফিরেনি পাহাড়ে শান্তি।

পার্বত্য এলাকায় শান্তিচুক্তির পর যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছিল তাদের অধিকাংশই বাঙালি। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ পাহাড়ি। বাঙালিরা খুন হয়েছেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও চাঁদাবাজির জের ধরে।

অন্যদিকে পাহাড়িদের অধিকাংশই নিহত হয়েছেন দলীয় কোন্দলের কারণে। ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২২তম বর্ষপূর্তি। ১৯৯৭ সালে এইদিনে বাংলাদেশ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চুক্তি সম্পাদিত হয়। যে চুক্তির ফলে প্রাথমিকভাবে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। সরকার তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। কিন্তু এই চুক্তির ২২ বছর পার হলেও পাহাড়ে এখনও পুরোপুরি শান্তি ফেরেনি। এখনও ঘটছে গোলাগুলি, রক্তক্ষয়ী সংঘাত, সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, খুন, গুম ও অপহরণসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।

শান্তি চুক্তির বছর যেতে না যেতে প্রতিষ্ঠা হয় চুক্তিবিরোধীসংগঠন ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এরপর থেকেই শুরু হয় পাহাড়ে দুই আঞ্চলিক দলের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। থেমে থেমে চলে দুই সংগঠনের হত্যা-পাল্টা হত্যা।

২০০১ সালে তিন বিদেশি অপহরণের মাধ্যমে শুরু হয় পাহাড়ে অপহরণ বাণিজ্য। পরে ২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বের হয়ে ২০১০ সালে আরেক আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালে এসে ইউপিডিএফ থেকে বের হয়ে আরেকটি সংগঠনের জন্ম হয়। যেটি ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে পরিচিত।

এরপর বিভিন্ন সময় চার পক্ষের কর্মী, সমর্থক হত্যার মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে, গত এক বছরে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে পাহাড়ে প্রায় ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে আপাত দৃষ্টিতে চার পক্ষের কর্মী, সমর্থকদের হত্যা চললেও এসময় পাহাড়ে ১৯৯৭ সালের পূর্বের চাইতে অনেকটা শান্তি স্থাপন হয়। পাহাড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বৃদ্ধি পায়।

বিশ্ববাসীর কাছে পার্বত্যাঞ্চলের পর্যটনও ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। কিন্তু চুক্তির এতো বছর পর এসেও চুক্তি বাস্তবায়ন না করার জন্য ‘জেএসএস’ সরকারকে দোষারোপ করতে দেখা যায়। ধারা বাস্তবায়ন নিয়ে চলছে দুই পক্ষের তর্কযুদ্ধ। এই ২২ বছর ধরে ‘জেএসএস’ চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে রাজপথে বেশিরভাগ সময় সক্রিয় ছিলো, পক্ষান্তরে ইউপিডিএফ সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ, পার্বত্যাঞ্চলে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছে।

অন্যদিকে জেএসএস (সংস্কারপন্থী) পক্ষও চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে লিপ্ত রয়েছে। তবে চুক্তি নিয়ে তেমন কোনও কথা এখনো ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর তরফ থেকে শোনা যায়নি।

গত ২২ বছরে খাগড়াছড়িতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। জেলার বাসীর বিদ্যুৎতের চাহিদা মেটাতে ঠাকুরছড়া, ১৩২কেভি পাওয়াগ্রীড নির্মাণ করা হয়েছে, সরকার দূর্গম এলাকায় যেখানে অন্ধকার ছিল সেখানে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে সকল মানুষকে আলোর মূখ দেখিয়েছেন, ১০ হাজার পরিবারকে সৌর বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। আরো ১০ হাজার পরিবারকে বিদ্যুতের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

খাগড়াছড়িতে কালভার্ট, ব্রিজ,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয়, কলেজ প্রাইমারি শিক্ষকদের ট্রেনিংসেন্টার (পি টি আই ভবন) খাগড়াছড়ি ডাইবেটিস হাসপাতাল, সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। চুক্তির পূর্বে পাহাড়ে দুর্গমাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম তেমন একটা না থাকলেও বর্তমানে জেলার প্রতিটি ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করাহয়েছে।শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষিসহ সব ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে পার্বত্য তিন জেলার ২৬টি উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি ৪৪টি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক সময় ৫০ কিলোমিটার সড়ক যোগাযোগ ছিল। এখন তা ১ হাজার কিলোমিটার হয়েছে। হাসপাতাল সহ সাধারণ মানুষের উন্নয়নে দূর্গম পাহাড়ী জনপদে সরকারের উন্নয়নের ফলে মানুষের জীবনযাএার মানউন্নয়ন সহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক পরির্তন হয়েছে।

পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেছেন, শান্তি চুক্তির কারণেই পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাহাড়ের মানুষ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। সহিংসতা দূর করতে হলে সংবিধানের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন এবং স্থানীয় সব শ্রেণির জনগণ সঙ্গে নিয়ে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ পাহাড়ি মানুষ শান্তি চায়। এজন্য পাহাড়ি-বাঙালি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে থাকতে হবে।সবাই উদার মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসলে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির সুবাতাস ফিরে আসবে।

খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্ত্রমুক্ত করতে, এখানে রক্ত ঝরানো বন্ধ করতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তি হয়। সেই চুক্তির দুই দশক পরও যখন রক্ত ঝরছে, লাশ পড়ছে, শক্ত হাতে সন্ত্রাসীদের দমন করা হবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আইন অনুযায়ী সব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে শক্তহাতে দমন করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে, জনগণকে জিম্মি করে উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। পার্বত্য শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সরকার বাস্তবায়ন করেছে। ১৫টি ধারার আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। বর্তমানে ৯টি ধারা বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা
শান্তি চুক্তির ২২তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পার হলেও চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ বিষয় এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার বরং পার্বত্যচুক্তিবিরোধী বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। আগামী ১লা ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি পৌর টাইন হল মাঠে মেলার মধ্য দিয়ে শুরু হবে ২২তম পার্বত্য শান্তি চুক্তি
বর্ষপূর্তির কর্মসূচী। ২’রা ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে সকালে শান্তির
পায়রা বেলুন উড়িয়ে বর্ণাঢ্য র‌্যালির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে পৌর টাইন হল মাঠে ডিসপ্লে ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। পরে ঐতিহাসিক খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে বিকেলে সাংস্কৃতিক ওসম্প্রীতি শান্তি কনসার্টসহ তিন দিনব্যাপি নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছে খাগড়াছাড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ

আরও পড়ুন