৮ নভেম্বর ২০২৬

পটিয়ার আশিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বেহাল দশা

পটিয়া প্রতিনিধি »

চট্টগ্রামের পটিয়ার আশিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেদ্রের বেহাল দশা। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপিত এ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র, কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক চলছে অনেকটা নামেই।

কাগজে-কলমে একজন করে মেডিকেল অফিসার নিযুক্ত থাকলেও অধিকাংশ সময়ই সেখানে রোগী দেখেন না। তারা জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা হাসপাতালে ডেপুটেশনে কর্মরত আছেন। ফলে গরিব অসহায় রোগীরা সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রতিটি ইউনিয়নে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করে একজন করে এমবিবিএস ডাক্তার দেয়া হয়।

সরকারি সিদ্ধান্ত মতে, প্রতিটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে একজন এমবিবিএস ডাক্তার, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও একজন অফিস সহায়কের পদ রয়েছে। কিন্তু আশিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমবিবিএস ডাক্তার ও ফার্মাসিস্ট নেই।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নতুন নিয়োগকৃত মেডিকেল অফিসারদের প্রথম যোগদান ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে হওয়ার কথা। সেখানে ২ বছর বাধ্যতামূলক থাকার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বদলি করার কথা বলা হয়েছে। অথচ এসব নিয়ম অমান্য করে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তাররা তদবির করে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে ডেপুটেশনে চাকরি করছেন।

আশিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রের সামনে আনোয়ারা বেগম নামে মহিলা জানান, এ স্বাস্থ্য কেন্দ্র কোনদিন ডাক্তার কিংবা কাউকে পাওয়া যায় নি। সামান্য অসুস্থ বোধ করলে ছুটে যেতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

জানা যায়, বিগত বিশ বছর ধরে এটি জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। বিদ্যুৎ, আসবাবপত্র, দরজা জানালা এমনকি পানির ব্যবস্থাও নেই। নিজেই রোগীতে পরিণত হয়েছে এটি!

সূত্র জানায়, এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, একজন উপসহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও একজন এমএলএসএস থাকলেও খালি আছে ফার্মাসিস্ট ও নৈশপ্রহরীর পদ। সব মিলিয়ে বেহাল দশার সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে সাইনবোর্ড থাকলেও নেই চিকিৎসক কিংবা চিকিৎসা সেবার কোন উপকরণ। বাহির হতে বুঝতে পারার জন্য একটি টিনের সাইনবোর্ড ইদানিং টানিয়ে দিয়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা। বাইরে যেনতেন কিন্তু ভিতরে গেলেই ভূতুড়ে বাড়ি বোঝারও উপায় নেই এটি যে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। হাসপাতালটির যাতায়াতের জন্য নেই কোনো সড়ক, ভবনের চারদিকে কাচের দরজা জানালা গুলো ভাঙা অবস্থায় রয়েছে।

দায়িত্বরত ডাক্তারদের জন্য নেই কোনো ভালো আসবাবপত্র। ভবন জুড়ে ফাটল। যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। দেখাশোনার জন্য নৈশপ্রহরী থাকার কথা থাকলেও তাও নেই, নেই বিদ্যুৎ ও পানি। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বসার কোনো তেমন চেয়ার টেবিলও নেই। হাসপাতালে আসা যাওয়ার জন্য সড়কটির ও বেহাল দশা। বর্ষাকালে আরো করুন দশা কোমর সমান পানিতে সয়লাব হয়ে যায়।

পটিয়ার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া রয়েছে কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এসব সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপিত হলেও জনগণ বঞ্চিত কাক্সিক্ষত সেবা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে। উপজেলার আশিয়া, কাশিয়াইশ, বড়লিয়া , জঙ্গলখাইন, চনহরা, কুসুমপুরা, হাবিলাসদ্বীপ, পাচুরিয়া,কোলাঁগাও, কচুয়াই, ভাটিখাইন, কেলিশহর, ধলঘাট, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং হেলথ ক্লিনিক।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এসব সরকারি ক্লিনিকে ডাক্তার কর্মরত আছেন কিনা আদৌ জানা নেই। সপ্তাহে দুই-একদিন কয়েকজন স্বাস্থ্য কর্মীর দেখা মেলে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা বলতে কিছু নেই। সরকারি কোনো ওষুধপত্রও মেলে না।

স্থানীয় বাসিন্দা হাজী সাইফুদ্দিন চৌধুরী ও মাহমুদুল হক বলেন, এ যাবৎ পর্যন্ত কোন ডাক্তার কিংবা কোন কর্মকর্তার উপস্থিতি চোখে পড়েনি। তবে একজন লোক দশটা এগারোটার দিকে এসে বারোটার দিকে চলে যায়। আমাদের প্রশ্ন তাহলে এ হাসপাতালের বরাদ্দকৃত ওষুধ গুলো কোথায় যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ ফ্যামেলি প্লানিং ইন্সপেক্টর ওসমান গনির আশিয়া বাংলা বাজারে তার নিজস্ব ওষুধের দোকানে সরকারি ওষুধ বিক্রি করছে। তবে পারভিন আকতার নামের একজন এফ ডাব্লিউ ভি আশিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হাজিরা খাতা অনুযায়ী উপস্থিতির স্বাক্ষর থাকলেও তিনি কোন দিন এ হাসপাতালে আসেনি। তবে তিনি নাকি এখন তিন মাস ধরে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। এছাড়াও মুমমুন চৌধুরী নামের একজন আয়া ও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর থাকলেও তিনি ও নাকি ডেপুটেশনে অন্য কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করেন।

সরেজমিনে পাওয়া গেছে অফিস সহায়ক বদরুল আলমকে। তিনি গুরে গুরে পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জীর্নদশার অবস্থা দেখান। তিনিও নাকি গত পাঁচ বছর ধরে এ কেন্দ্রে থাকলেও কোন ডাক্তার কিংবা অন্য লোকজনকে চোখে ও দেখেনি।

এ ব্যাপারে পটিয়া উপজেলা ফ্যামেলি প্লানিং অফিসার ডা. জাকিয়া মমতাজ বলেন, উপজেলার প্রায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তার মধ্যে আশিয়াও রয়েছে। লোকলব অনুপস্থিতির প্রশ্ন করলেই তিনি বলেন, এফ ডাব্লিউভি পারভিন আকতার মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। তাই অন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র হতে একজনকে আশিয়াতে আনা হয়েছে। জরাজীর্ণ অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উপরস্থ কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ