বাংলাধারা প্রতিবেদন »
করোনাভাইরাসের কারণে চীন থেকে সকল পণ্য রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে করে আসন্ন দু’টি ঈদকে কেন্দ্র করে পণ্য আমদানির জন্যও চট্টগ্রামসহ দেশের কোন ব্যবসায়ী চীনে প্রবেশ করতে পারছেন না। তাছাড়াও একই কারণে ইতোমধ্যেই চীন থেকে আমদানিকৃত স্বল্পমূল্যে চাহিদা সম্পন্ন সকল পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
গ্রাহকদের কাছে তুলে দেওয়ার প্রতিযোগিতার দৌড়ে প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে চীন। নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সকল পণ্যই বাংলাদেশে সরবরাহ করে দেশটি। তবে সম্প্রতি করোনাভাইরাসের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সারাদেশের ন্যায় চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে বড় হুমকি আসতে পারে বলে মনে করছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।
এদিকে চট্টগ্রামের প্রত্যেকটি বাজারে এখনও দেখা মিলছে চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্য। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাব বহাল থাকলে খুব দ্রুতই বাজারে পণ্যের সংকট দেখা দিবে। যার প্রভাব পড়বে চট্টগ্রামসহ সারাদেশের অর্থনৈতিতে।
জানা গেছে, চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বর্তমানে চট্টগ্রামের বড় একটা বাজারের অর্থনীতি সচল রয়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স বাজারের প্রায় বারো আনাই চায়না বাজারের দখলে। হেডফোন, মোবাইল, ব্লু টুথ, চার্জার, টিভি, ফ্রিজ, ফ্যান, লাইট, এসি, কসমেটিকস, সাইকেল, বাইক, হরেক রকমের খেলনা, গেঞ্জী, জ্যাকেট, ব্যাগ, জুতা, স্যান্ডেল, ল্যাপটপ, ঝাড়বাতি, আসবাবপত্র, ভিডিও গেম, চায়না লেবু, চায়না আদাসহ নিত্য প্রয়োজনীয় প্রত্যেকটি জিনিসেই রয়েছে চীনের আধিপত্য।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সূত্র জানায়, সম্প্রতি করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার চীনের সরকার সেদেশে বিশেষ ছুটি ঘোষণা করেছে। যা আজ ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকলেও সেটা বাড়িয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি চীনে প্রবেশের জন্য ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে ভিসার আবেদন নেওয়া বন্ধ রয়েছে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির পর জানানো হবে কবে থেকে ভিসার আবেদন পুনরায় নেওয়া শুরু হবে।
তাছাড়া চীনে বিশেষ ছুটি ঘোষণা হওয়ায় সকল প্রকার রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। আগামী ঈদ-উল ফিতর ও ঈদ-উল আযহাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা চীনে যেতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে তারা মনে করছেন, খুব দ্রুত এই সংকট কেটে যাবে। ততদিন পর্যন্ত গুদামজাত পণ্য দিয়ে চট্টগ্রামের মার্কেট চললেও মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে কি না এমন মন্তব্য এখনই করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে সংকটের সম্ভবনা রয়েছে।
রিয়াজউদ্দীন বাজারের ব্যবসায়ী পারভেজ জানান, তিনি সম্প্রতি চীন থেকে শিশুদের হরেক রকমের খেলনা, ক্যালকুলেটর, ঘড়ি, সাইকেল, বেলুনসহ অত্যাধুনিক ডিজিটাল ইলেকট্রনিক পণ্য এনেছেন। যা বর্তমানে বাজারে আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। স্টক শেষ হওয়ার আগে চীন থেকে পণ্য আমদানি করতে না পারলে বাজারে সংকট ও মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকবে।
নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী শিপলু জানান, অল্প দামে চায়না টিভি, মোবাইল, ক্যামেরাসহ বিভিন্ন ডিভাইসের চাহিদা অনেক। তার পণ্যের স্টক শেষের দিকে। ফেব্রুয়ারি মাসেই চীনে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে করোনা ভাইরাসের কারণে সব পরিকল্পনা পরিবর্তন করা লাগছে।
কয়েকজন পাইকারী ব্যবসায়ী জানান, ইতিমধ্যে বাজারে চায়না লেবু, চায়না আদাসহ বিভিন্ন পণ্যের সংকট দেখার পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিচ্ছে। যার মূল কারণ করোনাভাইরাস।
এদিকে করোনাভাইরাসের প্রভাবে চীন থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চে যেসব পণ্য বাংলাদেশমুখী জাহাজে বোঝাই করার কথা, তা অন্তত ১০ দিন পিছিয়ে গেছে। চীনে নববর্ষের ছুটি আরও বাড়ানো হলে এই সময় আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাতে কিছুদিন পর উৎপাদন খাত থেকে শুরু করে প্রকল্পকাজ ব্যাহত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আসছে চীন থেকে, যেগুলোর প্রক্রিয়া শুরু হয় নববর্ষের ছুটির আগে। চীন থেকে পণ্য আমদানিতে ১৪ থেকে ২২ দিন সময় লাগবে। ফলে এখন পণ্য জাহাজীকরণ পিছিয়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে শুরু করবে এ মাসের শেষে। চট্টগ্রাম বন্দর, জাহাজ কোম্পানি ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
খাতুনগঞ্জের মসলা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফারুক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার ফারুক আহমেদ বলেন, চীনের রপ্তানিকারকেরা ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে সব সচল হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন। ছুটি আবার বাড়লে সমস্যায় পড়তে হবে। চীন থেকে ভোগ্যপণ্য আমদানি হয় কম। শুধু রসুন, আদা ও দারুচিনি—এই তিনটি মসলা আমদানি হয়। এই তিনটির সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে পেঁয়াজ।
রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে সমুদ্রপথে আমদানি হওয়া রসুন শতভাগই আসে চীন থেকে। গত অর্থবছর বন্দরটি দিয়ে চীন থেকে ৬৪ হাজার ৭৯৬ টন রসুন আমদানি হয়। এবার নববর্ষের ছুটি শুরু হওয়ার আগের মাসে ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ রসুন আমদানি করেছেন। গত ডিসেম্বরে সাড়ে ১৮ হাজার টন রসুন আমদানি হয়। এরপরও করোনাভাইরাসের অজুহাত তুলে রসুনের দাম কেজিতে ৪৫ টাকা বেড়ে ১৭০ টাকায় উঠেছে পাইকারি বাজারে।
রসুনের মতো বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া আদার ৬০ শতাংশ আসে চীন থেকে। ভাইরাসের অজুহাতে আদার দামও বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা। এ ছাড়া দারুচিনি আমদানির ৬৭ শতাংশই আসে চীন থেকে। বাকিটা ভিয়েতনাম থেকে। ভাইরাসের অজুহাতে এই পণ্যেরও দাম কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পাইকারি বাজারে। মসলা ছাড়া ৭০ শতাংশ আপেল আমদানি হয় চীন থেকে।
তথ্য মতে, বাংলাদেশ সারাবিশ্ব থেকে যে পরিমাণ পন্য আমদানি করে তার প্রায় এক তৃতীয়াংশ আসে চীন থেকে। গত অর্থবছর চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। তাই চীনের ওপর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির নির্ভরশীলতার হারটাও অনেকখানি। বিশেষ করে, ইলেকট্রনিক পণ্যের প্রায় ৯০ ভাগই নির্ভর করতে হয় চীনের ওপর। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের ইলেকট্রনিক খাতে।
আমদানিকারকরা জানান, চীন থেকে পন্য আমদানি করতে সময় প্রয়োজন হয় ১৫ থেকে ২০ দিন। আর ১৫ ফেব্রুয়ারির পর চীন তাদের বাজার খুললেও দেশের বাজারের এই সংকট কমতে কমপক্ষে আরো এক মাস সময় লাগবে বলে জানান তাঁরা।
বাংলাধারা/এফএস/টিএম












