৮ নভেম্বর ২০২৬

করোনার গ্রাসে লণ্ডভণ্ড চট্টগ্রাম; সর্বত্রই অসচেতনতা-শপিংমলে উপচেপড়া ভিড়

মোহাম্মদ সৈকত »

টানা দুই সপ্তাহ ধরে করোনার প্রকোপ ঊর্ধ্বমুখী কিন্তু মানুষের মাঝে নেই কোন সচেতনতা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, করোনা থেকে নিজেকে রক্ষার প্রধান ঢাল মাস্ক ব্যবহার করা ।

কিন্ত অধিকাংশ মানুষই তা মানছে না। মানুষের এই ধরনের খামখেয়ালীপনা আচরণ চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ।

রাস্তার গণপরিবহন থেকে শুরু করে বাজার, অফিস থেকে শুরু করে আদালত প্রায় সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ মানুষ মাস্ক ছাড়া চলাচল করছেন । তিন ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা তো অনেক দূরের ব্যাপার। মাস্কবিহীন একজন ব্যক্তি নিজের পাশাপাশি অন্যদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন।

সচেতনরা বলছেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ না হলে আমরা যেকোন বিষয় নিয়ে হেলাফেলা করি এমনকি সেটা নিজের জীবন বিপন্ন হলেও ।

গত বছর প্রশাসন কঠোর হওয়ায় মানুষের মাঝে মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল । বর্তমান পরিস্থিতিতেও প্রশাসনের সেই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া অতীব জরুরী ।

গত বছরের জুন-জুলাই মাসে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চূড়ায় (পিক) অবস্থান করেছিল। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার করোনা শনাক্ত হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার অনেকটাই কমে গিয়েছেল।

কিন্তু এ বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে আবারো করোনা সংক্রমণের হার এবং মৃত্যু আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে । সপ্তাহখানেক ধরে প্রায় প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজারের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে ।

এমতাবস্থায় সরকার সোমবার (৫ মার্চ) থেকে প্রাথমিকভাবে দেশব্যাপী ৭দিনের লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে । পরিস্থিতি বিবেচনায় এই লকডাউন দীর্ঘায়িত হতে পারে ।

এ বিষয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘এক সপ্তাহের ঘোষিত লকডাউন যদি আমরা মেনে চলি এটি দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম৷ আর না মেনে চললে সংক্রমণের হার বাড়বে, লকডাউন দীর্ঘায়িত হবে, সবার কষ্টই আবারো বাড়বে। রমজানের আগেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক চাইলে আসুন দয়া করে একটু মেনে চলার মানসিকতা ধারন করি। সকাল বিকাল ত্রান দেয়া বা নেয়ার জন্যেও প্রথম সপ্তাহ ছোটাছুটি করার প্রয়োজন নেই।’

‘লকডাউনে মধ্যবিত্তের চাইতে দৈনিক ভিত্তিতে জীবিকার জন্য সংগ্রাম করা সাধারণ মানুষের কষ্টই সবচেয়ে বেশি। এঁদের কেউ লকডাউন চান না, এঁরা কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখা মানুষগুলোর মতো অভিযোগ করে না, কভিডের লক্ষণ নিয়ে মারা যাওয়া নিয়ে আতংকিত হন না, কিন্তু এই কঠিন সময়ের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী এঁরাই! আবার নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করলেও বিপদ।’

দেশের সংক্রমণ যেমনি বাড়বে, স্বাস্থ্য সেবার উপরে চাপ বাড়তে থাকবে, বাইরের দেশগুলোও আমাদের চলাচল সংকুচিত করবে। বিপদ দেশে এবং বিদেশে, সর্বত্র। তাই নিষেধাজ্ঞাগুলো মেনে চলার এবং সংক্রমণ না কমানোর কোনো বিকল্প নেই।

এদিকে চট্টগ্রামেও করোনা সংক্রমণের হার ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। গত কয়েক দিন ধরে গড়ে সাড়ে তিনশোর বেশী মানুষ কভিড পজেটিভ হয়েছেন।

প্রশাসনের নানা উদ্যোগের পরও স্বাস্থ্যবিধি মানতে এখনও উদসীন সাধারণ জনগণ। মাস্ক ছাড়াই নগরের বিভিন্ন শপিংমল এবং বাজারগুলোতে কেনাকাটা করছে সাধারণ মানুষ। সোমবার থেকে লকডাউনের খবর শুনে অনেকেই বেরিয়েছেন নিজের প্রয়োজনীয় কাজটি সারতে।

নগরের টেরিবাজারে শপিং করতে আসা কামাল হোসেন বাংলাধারাকে জানান, ‘সোমবার থেকে সারাদেশ লকডাউনে যাচ্ছে। সময়টা এক সপ্তাহ বললেও কখন খুলবে তা বলা যায় না। তাই কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সারতে শপিংয়ে আসতে হয়েছে।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডাঃ শেখ ফজলে রাব্বি জানান, ‘করোনা মোকাবেলায় নিজ সচেতনতার কোন বিকল্প নাই। আমাদের মাস্ক পরার পাশপাশি নিয়মিত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিস্কার করতে হবে। করোনার লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে ঘরে থেকেই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব । শ্বাস কষ্ট দেখা দিলে দ্রুত অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে হবে।’

এছাড়া তিনি আরও বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল প্রস্তুতি শেষ করেছি ।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ বিদ্যুৎ বড়ুয়া জানান, ‘করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি সচেতনতা জরুরী। আমরা দেখতে পাচ্ছি গত মার্চ থেকে করোনার হার ঊর্ধ্বমুখী । শুধুমাত্র নিজেদের অবহেল , অযত্ন আর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে করোনার প্রকোপ বেড়ে গেছে ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি লক্ষণ শুরুর প্রথম থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলি তাহলে আইসিউ এর প্রয়োজন হবে না । সুতরাং আমরা সচেতন হয়ে সজাগ হয়ে যদি প্রথম থেকেই চিকিৎসকের কথা মত চলি তাহলে ভয়ের কারণ নেই।’

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন পরিচালক । এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবির বাংলাধারাকে জানান, ‘করোনা ছাড়াও সব ধরণের রোগীদের ভরসাস্থল এই হাসপাতাল । করোনা রোগীদের জন্য আমাদের ১০টা আইসিউ বেড প্রস্তুত আছে। আমরা প্রায় একসাথে ২০০ এর মত রোগী সেবা দিতে পারবো। আমাদের ১০০টি হাই ফ্লো অক্সিজেন নজেল ক্যানেল রয়েছে । আমরা আমাদের সাধ্যমত সব প্রস্ততি সম্পন্ন করেছি ।’

বাংলাধারা/এফএস/এআই

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ