সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার »
চলমান সময়ে সারাদেশের আতংক ডেঙ্গু জ্বর। এ থেকে বাদ যায়নি পর্যটন শহর কক্সবাজারও। বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ২১ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। আরো একাধিকজন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নোবেল বড়ুয়া।
গত শনিবার রেফার হয়ে চট্টগ্রাম যাবার পথে মারাগেছেন জাবির শিক্ষার্থী কক্সবাজার পৌরসভার মেয়ে উখিনু নুশান রাখাইন। আর বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) দুপুরের দিকে ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন কক্সবাজারের টেকনাফে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিতসাধীন আবদুল মালেক (৩৫)। তিনি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা লতা ফকিরপাড়ার বাসিন্দা মাষ্টার আবুল কাশেম প্রকাশ কাশেম সওদাগরের ছেলে।দীর্ঘদিন ধরে তিনি টেকনাফ পৌরসভার উপরের বাজারে ’মনে রেখো’ নামের একটি কাপড়ের দোকান চালাতেন বলে জানিয়েছেন তার ছোট ভাই রাশেল।
বুধবার রাত হতে বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৪ রোগী ভর্তি হয়েছেন। বুধবার সারাদিন ভর্তি হন ৬ জন। প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্থাপনকরা ডেঙ্গু কর্ণারে রোগীর সংকুলান হচ্ছে না। তাই কর্ণার ছাড়াও ওয়ার্ডেও বিশেষ ব্যবস্থায় চিকিতসা দেয়া হচ্ছে।
শুরুতে ঢাকা কিংবা বাইরের জেলা থেকে জীবাণু শরীরে নিয়ে আসাদের মাঝে ডেঙ্গু পাওয়া গেলেও কয়েকদিন ধরে বদলেছে এ চিত্র। রাজধানীসহ বাইরের জেলায় দীর্ঘদিন না গিয়েও কক্সবাজারে অবস্থানকরা কয়েকজনের মাঝে ডেঙ্গুর জীবাণু পাওয়া গেছে। এটি প্রচার পাবার পর স্থানীয়দের মাঝে উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে।
সূত্র মতে, পাহাড়, সাগর ও নদী বেস্টিত পরিবেশে কক্সবাজারে ম্যালেরিয়া জীবাণুবাহি মশা বিস্তারের ইতিহাস আছে কিন্তু এডিস মশার বংশ বিস্তারের পরিবেশ নেই বললেই চলে। ফলে এখানে কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না।
কিন্তু ঢাকা থেকে কক্সবাজারে আসা বিমান ও এসি বা নন এসি বাসে করে এডিস মশা কক্সবাজারে আসছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। বিশেষ করে দূরপাল্লার এসি বাসগুলোতে এডিস মশা সহগে বংশ বিস্তার করতে পারে বলে ধারণা ওয়াকিবহাল মহলের।
কয়েকজন চিকিৎসকও এ ধারণাকে সমর্থন দিয়েছেন। বিভিন্ন তথ্যের কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, এডিস মশার আয়ুকাল দুই সপ্তাহ থেকে প্রায় এক মাস। আর উল্লেখিত সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে আসা বাস কিংবা বিমানের সঙ্গে এডিস মশা খুব সহজেই কক্সবাজারে প্রবেশ করতে পারে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মহিউদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এডিস মশা নিধন জরুরী। দূরপাল্লার বাস কিংবা বিমানে এডিস মশা আসছে না, এটা অস্বীকারও করা যাবে না। তাই বিমানবন্দর এবং বাস টার্মিনালে সতর্কতা জারি করা প্রয়োজন। তবে, তার মতে- কক্সবাজারে পাওয়া ডেঙ্গু রোগীরা ঢাকা বা বাহিরের জেলা থেকে রোগবহন করে নিয়ে এসেছেন।
কিন্তু শহরের উত্তর নুনিয়াছড়ার (কক্সবাজার বিমানবন্দর এলাকা) বাসিন্দা মোবারক (৩৮) বলেন, আমি ঢাকা যাই না কয়েক বছর হলো। মাছের ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করি। সপ্তাহখানেক আগে শরীরে প্রচন্ড জ্বর ও সাথে রক্ত বমি করি। এরপরই কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এলে পরীক্ষার পর শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। ৬দিন ধরে আমি হাসপাতালে ভর্তি। এখন কিছুটা ভালো লাগছে।
মোবারকের মতো চিকিৎসাধীন আবু রাখাইনও ঢাকা যাননি ইদানিংকাল। সদর উপজেলার চৌফলদন্ডীর বাসিন্দা আবু দীর্ঘদিন ধরে টেকনাফে স্বর্ণকারের কাজ করেন। ৫ দিন আগে হঠাৎ করে তাঁর শরীরে জ্বর হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান। তার পরামর্শমতো রক্ত পরীক্ষা করে শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সেই থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ভর্তি রয়েছেন তিনি।
টেকনাফেও ঢাকা থেকে সরাসরি বাস রয়েছে। তাই বাইরে থেকে আসা মানুষের পাশাপাশি জেলায় বসবাসকারীদের মাঝেও ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়াচ্ছে। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মাঝে শহরের উত্তর নুনিয়াছড়া, বাহারছড়া, গোলদিঘিরপাড়, বাস টার্মিনাল, মহেশখালী, উখিয়া, টেকনাফ এবং ঈদগাঁও এলাকার বাসিন্দা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা ঢাকা, কিংবা চট্টগ্রামের মতো শহরেও যাননি।
যতই দিন যাচ্ছে সদর হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগির সংখ্যা। ডেঙ্গু আক্রান্ত পুরুষদের জন্য সদর হাসপাতালের পক্ষ থেকে একটি কক্ষ স্থাপন করা হলেও সেখানে রোগিদের ঠাঁই হচ্ছে না। জায়গা না থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফ্লোরে চিকিৎসা দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে কক্সবাজারে আসা এসি ও নন এসি গাড়ি, পর্যটকদের সঙ্গে আনা বিলাসবহুল গাড়িগুলো কক্সবাজারে প্রবেশের সময়ই এবং ল্যান্ড করা বিমানবন্দরগুলোর পাশাপাশি পার্কিং এলাকা মশকমুক্ত করা গেলে এডিস মশার ভয় কিছুটা কমবে।
পাশাপাশি এডিস মশার বংশ বিস্তার থামাতে করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রমও চলমান রাখতে হবে।
কক্সবাজারের পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে এডিস মশার বিস্তার ও এর রোধ সম্পর্কে সচেতনা সৃষ্টিতে মাইকিং করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি হতে পারে সেখানে স্প্রে করাও অব্যাহত রয়েছে। ভীতি কাটিয়ে সেবা বাড়াতে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন সকলে একীভূত হয়ে কাজ করছে।
বাংলাধারা/এফএস/এমআর












