জে.জাহেদ, কর্ণফুলী »
নতুন করে সরকার ভাড়া কার্যকর করার আগে গ্যাসের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে সিএনজি সমিতির সাথে তাল মিলিয়ে আরেক দফা সিএনজি অটোরিক্সার ভাড়া নির্ধারণ করে দিলেন কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদ।
ফলে সরকারিভাবে ভাড়া বাড়ার আগেই আজ থেকে শুরু হয়েছে নতুন ভাড়া আদায়। এ নিয়ে জনগণ বিব্রত ও এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
কেননা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় নয়, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিও নয় কেবল মাত্র স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের অধীনে থাকা উপজেলা পরিষদ কি করে তাদের নিজস্ব দাপ্তরিক প্যাডে সিএনজির নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে দিলেন এ নিয়ে সর্বত্রই আলোচনা হচ্ছে।
জানা যায়, স্বয়ং কর্ণফুলী থানা অটো রিক্সা ও অটো টেম্পু ফোর ষ্টোক শ্রমিক কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে গত সপ্তাহে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে একটি তালিকা প্রকাশ করে (ছবিতে আছে)। এতে তারা সিএনজি চালক সমিতি ও যাত্রী স্বার্থ রক্ষা কমিটির সাথে সমঝোতার কথাও জানিয়েছিলো।
সে সময় তালিকায় ভাড়া ছিলো- বোর্ড বাজার হইতে ব্রীজঘাট ১০ টাকা, বোর্ডবাজার হইতে সৈন্যেরটেক ৮ টাকা, বোর্ডবাজার হইতে মইজ্জ্যারটেক ১০ টাকা, বোর্ডবাজার হইতে খুইদ্দ্যারটেক ১০ টাকা, মইজ্জ্যারটেক হইতে সৈন্যেরটেক ১০ টাকা, ব্রীজঘাট হইতে খুইদ্দ্যারটেক ১০ টাকা, আলী হোসেন মার্কেট হইতে ব্রীজঘাট ১৫ টাকা, পল্লী বিদ্যুৎ হইতে ব্রীজঘাট ১৫ টাকা, জুলধা পাইপের গোড়া হইতে ব্রীজঘাট ২০ টাকা, গোয়ালপাড়া হইতে ব্রীজঘাট ২০ টাকা, আলী হোসেন মার্কেট হইতে বোর্ডবাজার ৫ টাকা, খুইদ্দ্যারটেক হইতে মইজ্জ্যারটেক ৫ টাকা, পাইপের গোড়া হইতে বোর্ডবাজার ১০ টাকা, গোয়ালপাড়া হইতে বোর্ডবাজার ১০ টাকা ও সিরিয়ালের গাড়ি ওঠানামা ১০ টাকা।
এতে স্বাক্ষর করেছিলেন কর্ণফুলী থানা অটো রিক্সা ও অটো টেম্পু ফোর ষ্টোক শ্রমিক কল্যাণ বহুমূখী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আবু ও সম্পাদক মুহাম্মদ সেলিম।
কিন্তু পরিবহনে ভাড়া কার্যকর করতে গেলে স্থানীয় সাধারণ জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ফলে বিষয়টি নিয়ে দু’পক্ষই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের কাছে মৌখিক অভিযোগ করেন। সাথে দফায় দফায় বৈঠকে বসেন দু’পক্ষের লোকজন। পরে উপজেলা প্রশাসন নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ৭ দিন যাবত পুর্বের ভাড়া বহাল রাখার নির্দেশ দেন সিএনজি সমিতির নেতাদের।
সমিতির লোকজন প্রথমেই গ্যাসের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে ভাড়ার যে তালিকা প্রকাশ করে তারচেয়ে ৩ টাকা ভাড়া বাড়িয়ে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদ তাদের নিজস্ব প্যাডে লিখে দেন। যা কতটা যুক্তিযুক্ত জানা না গেলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ব্যাপক দৃশ্যমান রয়।
যাতে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা তালিকায় দেখা যায়, আখতারুজ্জামান চত্বর হইতে ব্রীজঘাট ১৩ টাকা, বোর্ডবাজার হইতে ব্রীজঘাট ১৩ টাকা, আলী হোসেন মার্কেট হইতে ব্রীজঘাট ১৮ টাকা, পাইপের ঘোড়া বাজার হইতে ব্রীজঘাট ১৮ টাকা, গোয়ালপাড়া হইতে ব্রীজঘাট ২৩ টাকা, মইজ্জ্যারটেক হইতে সৈন্যেরটেক ৮ টাকা, ব্রীজঘাট হইতে খুইদ্দ্যারটেক ৮ টাকা, খুইদ্দ্যারটেক হইতে মইজ্জ্যারটেক ৫ টাকা, বোর্ডবাজার হইতে সৈন্যেরটেক ৮ টাকা, মইজ্জ্যারটেক হইতে মইজ্যা ফকির ১০ টাকা, ব্রীজঘাট হইতে মইজ্যা ফকির ১০ টাকা, আলী হোসেন মার্কেট হইতে সৈন্যেরটেক ১০ টাকা! যেখানে অটো রিক্সা সমবায় সমিতির চাহিদাই ছিলো ১০ টাকা সেখানে ১৩ টাকা করে দিলেন উপজেলা পরিষদ তাতে স্থানীয় যাত্রী সেবা কতটা নিশ্চিত হলো জানা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ যাতে ঘোলা করতে না পারে সেদিকেও প্রশাসনের নজর বাড়ানো জরুরী।
অন্যদিকে, নতুন ভাড়ার হার দেখিয়ে সিএনজি অটোরিকশায় বেশি ভাড়া আদায়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে চালকদের।
ব্রীজঘাটে শফি আলম নামে এক যাত্রী বলেন, ‘কাল থেকে নতুন ভাড়ার হার কার্যকর হলে কর্ণফুলীতে জনভোগান্তি বাড়বে। সড়ক পরিবহন যেহেতু দাম বাড়ায়নি সেক্ষেত্রে ড্রাইভার ও যাত্রীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও নানা ছোটবড় ঝামেলা হতে পারে। সে সাথে ভাংতি ৩ টাকা নিয়ে।’
এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের সঙ্গে সিএনজি পরিবহনের ড্রাইভারদের সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, এমনকি ছোটখাটো হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। যা প্রতিরোধে ও ভাড়া নৈরাজ্য সমাধানে উপজেলা পরিষদের এগিয়ে আসা প্রশংসার দাবি রাখে।
চালকদের দাবি, গ্যাসের দাম বাড়ায় জ্বালানি খরচ বেড়েছে। এ কারণে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিতে হচ্ছে। মালিকের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিতে গাড়ি চালানোর কারণে বাড়তি ভাড়া না নিলে এ লোকসান তাদের বহন করতে হবে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। উচ্চ আদালতেও বিষয়টি শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। তাই মালিক-শ্রমিকরা এখনই বাড়তি ভাড়া আদায় করতে পারেন না।
সড়ক পরিবহন সুত্রগুলো জানায়, গ্যাসের দাম বাড়ার পর অটোরিকশা ও সিএনজির ভাড়া বাড়বে কি বাড়বে না, বাড়লে কত বাড়বে, তা এখনো নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিও ভাড়ার হার নির্ধারণের আগে বেশি ভাড়া না নিতে চালক ও মালিকদের নির্দেশ রয়েছে। ভাড়া নির্ধারণের আগেই বেশি ভাড়া আদায় করা হলে ব্যবস্থার কথাও জানান। ভাড়া নৈরাজ্যে কতটা লাগাম টানা সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা সংশয় প্রকাশ করেছে।
তাদের ভাষ্য, অতীতেও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পর সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক-চালকরা তাদের খেয়াল খুশি মতো ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছে। পরে বেশি ভাড়া আদায় করেছে, যা পরবর্তীতে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারও আগের মতো একই ঘটনা ঘটবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন কর্ণফুলীর যাত্রীরা।
এ বিষয়ে কর্ণফুলী থানা অটো রিক্সা ও অটো টেম্পু ফোর ষ্টোক শ্রমিক কল্যাণ বহুমূখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘নতুন করে সিএনজি পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত দিয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যান। কাগজটি আমাদের কাছে আছে। আজ থেকে সকল ভাড়ায় ৩ টাকা বেশি আদায় করা হবে। মইজ্জ্যারটেক হতে ব্রীজঘাট ১৩ টাকা করে।’
গত কয়েকদিন আগেও আপনারা তালিকা প্রকাশ করেছিলেন আলী হোসেন মার্কেট হইতে ব্রীজঘাট ১৫ টাকা বলে কিন্তু এখন আবারো ৩ টাকা বাড়িয়ে ১৮ টাকা কেন জানতে চাইলে এড়িয়ে যান তিনি।
ভাড়া নৈরাজ্য বিষয়ে সমস্যা সমাধানে কর্ণফলী উপজেলা পরিষদের এগিয়ে আসা নিঃসন্দেহে গৌরবের কিন্তু পরিষদের নিজস্ব প্যাডে সিএনজি অটোরিক্সা পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া যুক্তিযুক্ত কিনা জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ফারুক চৌধুরী কোন মন্তব্য করেন নি।
এ প্রসঙ্গে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ জানান,‘যাত্রী হয়রানী না করতে ও অতিরিক্ত ভাড়া না নিয়ে পুর্বের ভাড়ায় সিএনজি অটো রিক্সা চালাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিলো পরে শুনলাম নতুন সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
বাংলাধারা/এফএস/এমআর












