২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিদ্যুৎহীন কার্যালয়ে আটকে জনসেবা

পিডিবি-বিআরটিএ’র ঠেলাঠেলি— দুই সংস্থার দ্বন্দ্বের বলি সেবাপ্রার্থীরা

চট্টগ্রামের হাটহাজারী রোডের নতুনপাড়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ব্যাহত হয়েছে দাপ্তরিক কার্যক্রম। এতে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। কার্যালয় প্রাঙ্গণে বিভিন্ন যানবাহনের জট তৈরি হওয়ায় আশপাশের সড়কেও সৃষ্টি হয় যানজট। সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সামনে এসেছে সমন্বয়হীনতার চিত্র। আর এর খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ষোলশহর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ থেকে বিআরটিএ কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মোটরযানের কাগজপত্র জরিমানা ছাড়া হালনাগাদ করার শেষ দিনে এ ঘটনা ঘটায় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক সেবাগ্রহীতা প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে না পেরে অনিশ্চয়তায় পড়েন।

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কারণ নিয়ে পিডিবি ও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে দেখা দিয়েছে স্পষ্ট বিরোধ। পিডিবির দাবি, মিটারের বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। অন্যদিকে বিআরটিএর দাবি, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে তাদের কোনো লিখিত পূর্বনোটিশ দেওয়া হয়নি। দুই প্রতিষ্ঠানের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই ব্যাহত হয়েছে নাগরিকসেবা।

বকেয়া বিলের কথা বলছে পিডিবি
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ষোলশহর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, ‘মিটারের বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য বিআরটিএকে পাঁচ থেকে ছয়বার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো কর্ণপাত করেনি, বিষয়টিকে গুরুত্বও দেয়নি। এ ছাড়া ফোন করেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা ফোন রিসিভ করেননি।’

পিডিবির এই বক্তব্য অনুযায়ী, বকেয়া বিল পরিশোধ না করায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে বকেয়া বিলের পরিমাণ, চিঠি দেওয়ার তারিখ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পূর্বনোটিশ না পাওয়ার দাবি বিআরটিএ’র
এদিকে বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মো. সানাউল হক বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে পিডিবির পক্ষ থেকে আমাকে কোনো পূর্বনোটিশ দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে কোনো চিঠিও আমি পাইনি। তবে তারা ফোন করেছিল। ওই সময় সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকায় ফোন রিসিভ করতে পারিনি।’

বিআরটিএর এই বক্তব্যে পিডিবির দাবি করা একাধিক চিঠির বিষয়ে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। পিডিবি বলছে, তারা বারবার চিঠি দিয়ে ও ফোন করে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, বিআরটিএর উপপরিচালকের দাবি, তিনি কোনো লিখিত নোটিশ পাননি। যদিও পিডিবির পক্ষ থেকে ফোন করা হয়েছিল বলে তিনি স্বীকার করেছেন।

দুই প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে এই বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কোথায় ঘাটতি ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সেবার দিনে ভোগান্তিতে মানুষ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পিডিবির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ব্যবহৃত যানবাহনের ফিটনেস ও ট্যাক্স-টোকেন হালনাগাদ নিয়েও প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা রয়েছে। এসব যানবাহনের কাগজপত্র হালনাগাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইবাস কোডের অসংগতির কারণে বিআরটিএর বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাচ্ছে না বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এই জটিলতার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় হয়েছে, তা-ও স্পষ্ট নয়।

এদিকে, জরিমানা ছাড়া মোটরযানের কাগজপত্র হালনাগাদের শেষ দিনে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেবা নিতে আসা মানুষ বিপাকে পড়েন। কার্যালয় প্রাঙ্গণে যানবাহনের জট তৈরি হওয়ায় ভোগান্তি ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়কেও।

সমন্বয়হীনতার দায় নেবে কে?
সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বকেয়া বিল, নোটিশ এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধের কারণে নাগরিকসেবা ব্যাহত হলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে পিডিবি যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেছিল কি না, বিআরটিএকে দেওয়া চিঠিগুলো যথাযথভাবে পৌঁছেছিল কি না এবং দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের ঘাটতি ছিল কি না— এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে বকেয়া বিল পরিশোধ এবং প্রকল্পের যানবাহনের কাগজপত্র হালনাগাদসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে দুই প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, সরকারি দপ্তরের প্রশাসনিক বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হলে তা জনসেবার উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আরও পড়ুন