১৫ অক্টোবর ২০২৬

বারবার অভিযানেও বদলায়নি ‘উৎসব’, এবার জরিমানা গুনলো ৫ লাখ

বারবার অভিযান, জরিমানা ও সতর্কবার্তা— তবু যেন বদলাচ্ছে না চট্টগ্রামের পরিচিত ‘উৎসব’ সুপার মার্কেটের চিত্র। কখনো মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য, কখনো নষ্ট মসলা-চকোলেট, আবার কখনো পর্যাপ্ত পার্কিং না রাখা ও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয়ের অভিযোগে আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। এবার নগরীর পাঁচলাইশ এলাকায় পার্কিং ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অভিযানে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছে উৎসব সুপার মার্কেটকে। এর আগে একই প্রতিষ্ঠানের হালিশহর শাখায় নকশাবহির্ভূত স্থাপনা ও পার্কিং-সংক্রান্ত অনিয়মে আট লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নগরীর পাঁচলাইশ এলাকায় যানজট নিরসন এবং পার্কিং ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে অভিযান চালিয়ে উৎসব সুপার মার্কেটকে এ জরিমানা করা হয়। একই অভিযানে আল হিদায়াহ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলকে মোট ৪৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে ২০ লাখ এবং ভবন মালিককে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই এলাকার ফ্রোবেল প্লে স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, এর আগে পরিদর্শন অভিযান শেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় সিডিএর স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হামীমুন তানজিমের নেতৃত্বে পরিচালিত সংক্ষিপ্ত বিচার আদালত প্রতিষ্ঠান দুটিকে জরিমানা করেন।

সিডিএ জানিয়েছে, নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পার্কিং ব্যবস্থাপনা, যানবাহন চলাচল এবং সড়ক ব্যবহারে শৃঙ্খলা ফেরাতে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে। এর লক্ষ্য, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের কারণে সৃষ্ট যানজট কমানো এবং নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা।

আগেও আট লাখ টাকা জরিমানা
এর আগে গত ২৭ আগস্ট নগরীর হালিশহর এক্সেস রোডে উৎসব সুপার মার্কেটের একটি শাখায় অভিযান চালিয়ে আট লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সিডিএর অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত নকশা দেখাতে পারেনি। পরিদর্শনে বাণিজ্যিক ভবনটিতে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পার্কিং সুবিধা না থাকার বিষয়টি উঠে আসে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ রাস্তার জায়গায় গাড়ি পার্কিং করার কথা জানিয়েছিল। এসব অনিয়মের কারণে আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে আট লাখ টাকা জরিমানা করেন। পাশাপাশি ভবন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়, যাতে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় সংশোধন ও পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল।

সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন তখন অভিযোগ করেন, উৎসব সুপার মার্কেট কর্তৃপক্ষ নিয়মনীতি মানছে না। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পার্কিং সুবিধা না থাকায় সড়কে গাড়ি রাখার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

খাদ্যপণ্যের মান নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন
পার্কিং ও নকশা-সংক্রান্ত অভিযোগের বাইরেও উৎসব সুপারশপের বিরুদ্ধে অতীতে খাদ্যপণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। প্রকাশিত আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির পণ্যতালিকায় মেয়াদোত্তীর্ণ মোমো, নষ্ট মরিচ, মসলা ও চকোলেট পাওয়ার বিষয় উঠে আসে। আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যে যথাযথ লেবেল ও আমদানিকারকের তথ্য না থাকা এবং শিশুখাদ্য ও খাদ্য সম্পূরক বিক্রিতে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন বা অনুমোদনের ঘাটতির অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া একই সরঞ্জাম দিয়ে গরু ও খাসির মাংস প্রক্রিয়াকরণ এবং পণ্যের পুষ্টিতথ্য আড়াল করে নিজস্ব স্টিকার ব্যবহারের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছিল। এসব অনিয়মের ঘটনায় জরিমানার পাশাপাশি আমদানিকৃত ফলমূলের ক্রয়মূল্য ও সংশ্লিষ্ট তথ্য উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রয়োজনীয় পুষ্টিতথ্য ও অনুমোদন ছাড়া আচার এবং ‘হোমমেড’ পণ্য বিক্রির বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।

এর আগে গত এপ্রিলে হালিশহরের বড়পোল এলাকায় উৎসবের একটি শাখায় বন্যপ্রাণী প্রদর্শনের অভিযোগে অভিযান চালিয়ে সাপ, বানর ও টিয়াসহ বিভিন্ন প্রাণী উদ্ধারের খবরও প্রকাশিত হয়। তবে সেটি খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগের থেকে পৃথক ঘটনা।

নিয়মিত তদারকির দাবি ভোক্তা প্রতিনিধির
উৎসব সুপারশপের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ ও অভিযানের বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বারবার অভিযান ও জরিমানা করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি নিয়মনীতি মানছে না। তাঁর মতে, ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

তিনি ক্রেতাদেরও পণ্য কেনার আগে মেয়াদ, লেবেল, আমদানিকারকের পরিচিতি ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করার আহ্বান জানান।

এদিকে বিনিয়োগের টাকা ও লভ্যাংশ ফেরত চাওয়া নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ীর অভিযোগের খবরও আগে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সেটি অভিযোগ হিসেবে বিবেচ্য; আইনগতভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত একে প্রতিষ্ঠিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

উৎসব সুপার মার্কেটের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ ও জরিমানার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আজাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। এর আগে তিনি ফোন রিসিভ করে নামাজে থাকার কথা জানিয়ে কলটি কেটে দেন। ফলে ওই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিডিএর স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হামীমুন তানজিম জানিয়েছেন, নগরীর যানজট নিরসন ও সুশৃঙ্খল নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পরিদর্শন, সতর্কীকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধন না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ